ভালোবাসার লালে মাতোয়ারা দিন

 

বইমেলা প্রাঙ্গণে এই যুগল একে অপরকে ভালোবাসার বই উপহার দেনভালোবাসা একটি পবিত্র ও অতুলনীয় অনুভূতি। এই অনুভূতিতেই পৃথিবীর অধিকাংশ কাব্য রচিত হয়েছে। ভালোবাসার জন্য পৃথিবীর বহু মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে, আবার এই ভালোবাসার শক্তিই বাঁচিয়েছে প্রাণ। ভালোবাসা বিষয়টি সব সময়ের হলেও এটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে থাকে। পাশ্চাত্যের সঙ্গে মিল রেখে ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রমনাপার্কসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থান ঘুরে তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের ভালোবাসা বিনিময়ের চিত্র চোখে পড়ে।

শত ব্যস্ততার ফাঁকেও ভালোবাসা দিবসকে স্মরণীয় করে রাখতে চান বেশির ভাগ মানুষ। কেউ কেউ সকালেই বেরিয়ে পড়েন প্রিয় মানুষের সঙ্গে কিছু মুহূর্ত কাটাতে। কেউ কেউ বেরিয়েছেন পরিবারকে নিয়ে। রাজধানীর ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রমনা এলাকা ঘুরে দেখা যায় দিনটি উদযাপনে বেশিরভাগ মানুষই লাল রঙের পোশাক বেছে নিয়েছেন।

ভালোবাসা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুগলদেখা যায়, অনেকের মাথায় আছে ফুলের টিয়ারা, আর হাতে লাল গোলাপ। ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম এই গোলাপ। এ ছাড়া গোলাপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের গিফট। ধানমন্ডির বাসিন্দা আফজাল আহমেদ একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। সকালে বেরিয়েছেন পরিবার নিয়ে ঘুরতে। সাতমসজিদ রোডের জ্যামে আটকে গেছেন, পরিবার নিয়ে বিশেষ দিনে ঘোরার আনন্দে তবুও মুখে হাসি। তার সঙ্গে ছিলেন ছয় বছর বয়সী শিশু রাফিত ও স্ত্রী নিলুফার। বাচ্চাকে নিয়ে রিকশায় চড়ে যাচ্ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র দিকে। পথে কথা হলো এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তিনি জানান, পরিবার নিয়ে আজ বিশেষ দিনে একটু ঘুরতে বেরিয়েছি। জ্যামেই তো রাস্তায় সময় শেষ, এই বলে হেসে উঠলেন।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের লেক থেকে শুরু করে রবীন্দ্র সরোবরসহ পুরো লেক জুড়েই ছিল ভালোবাসা পূজারিদের মিলনমেলা। ধানমন্ডির এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগল বসে ছিলেন লেকের পাড় ঘেঁষে। একান্ত গল্পে তারা মগ্ন, প্রেমিকার হাতে লাল গোলাপ আর মাথায় টিয়ারা, প্রেমিকের হাতে বেলুন। কথা হয় তাদের সঙ্গে। জানা যায়, এই যুগলের বিয়ের কথাবার্তা পাক্কা। এ বছর পড়ালেখা শেষ হলেই বিয়ের পিড়িতে বসবেন তারা। বিয়ের আগে এই ভালোবাসা দিবস স্মরণীয় করে রাখতে চান তারা।

ভালোবাসা দিবসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যুগলরমনা পার্কের লেকের পাশেই ফুল হাতে অপেক্ষা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। প্রিয় মানুষ আটকে আছেন শাহবাগের জ্যামে। আসতে কিছুটা সময় লাগবে। ভালোবাসা দিবসের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, ভালোবাসার জন্য কোনও নির্দিষ্ট দিন থাকা ঠিক না। সারা বছরই মানুষের মানুষকে ভালোবাসা উচিত। তাহলে ঘৃণার জন্য আর কোনও জায়গা থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, রমনা পার্ক, শাহবাগ সকাল থেকেই ছিল লোকে লোকারণ্য। দুপুর গড়ানোর পর ভিড় আরও বাড়তে থাকে।

ভালোবাসা দিবস উদযাপনের ইতিহাস বেশ পুরানো। এ নিয়ে একাধিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজককের গল্প। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে ওই ধর্মযাজক একই সঙ্গে চিকিৎসকও ছিলেন। তখন রোমান সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় ক্লডিয়াস। বিশ্বজয়ী রোমানরা একের পর এক রাষ্ট্র জয় করে চলেছে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আরও সৈন্যবাহিনীর প্রয়োজন হয় রোমানদের। কিন্তু তরুণরা এই যুদ্ধে অংশ নিতে অনীহা প্রকাশ করে। রোমান সম্রাটের ধারণা ছিল, পুরুষরা বিয়ে করতে না পারলে, যুদ্ধে যেতে রাজি হবে। তিনি তাই যুবকদের জন্য বিয়ে নিষিদ্ধ করলেন। কিন্তু তরুণদের এই নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা যায়নি। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন এগিয়ে এসে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। একসময় শাসকগোষ্ঠীর হাতে ধরা পড়লেন সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। তাকে পাঠানো হলো কারাগারে। অনেক তরুণ-তরুণী তাকে দেখতে ফুল নিয়ে জেলখানায় যায়। এর মধ্যে ছিল দৃষ্টিহীন এক তরুণী। তার সঙ্গে ভ্যালেন্টাইনের হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপর তারা বিয়েও করেন। এ খবর পাওয়ামাত্র ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ড দেন রোমান সম্রাট। ফাঁসির দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে প্রিয়তমাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন তিনি, যার শেষ কথা ছিল – ‘লাভ ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন’