‘হাতজোড় করে নয়, এখন জোর করার সময়’

বৈঠকিতে অংশগ্রহণকারী আলোচকরাপুরান ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যালের গোডাউন সরাতে এখন আর হাতজোড় করে অনুরোধের সুযোগ নেই। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে করে জোর করে এগুলো সরাতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘মৃত্যুকূপ: শুধুই কি নিমতলী থেকে চকবাজার?’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব পরামর্শ দেন তারা।

সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

বৈঠকিতে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন বলেন, ‘কেমিক্যালের ব্যবসা অন্যত্র সরানোর জন্য হাতজোড় নয়, আমাদের এখন জোর করতে হবে। আমরা এখন এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি, এভাবে নিরীহ মানুষের মৃত্যু সহ্য করা আর সম্ভব নয়। আমরা এটা বাস্তবায়ন করবো, সবাইকে একযোগে একটা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নিয়ে এই সচেতনতা বৃদ্ধি করলে আমরা এর থেকে পরিত্রাণ পাবো বলে আমি মনে করি।’

ডা. সামম্তলাল সেনতিনি আরও বলেন, ‘আমরা আরও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল স্থাপন করেও পরিস্থিতি সামলাতে পারবো না, যদি না আমরা সচেতন হই। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে ছয় লাখ মানুষ পুড়ে হতাহত হচ্ছে বিভিন্ন কারণে, তার বেশির ভাগই হচ্ছে সচেতনতার অভাবে। কোনটা কীভাবে করতে হবে সে বিষয়ে আমরা জনসচেতনতা সৃষ্টি করি না, মনিটর করি না।’  

গওহর নঈম ওয়ারাদুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, ‘এখন অনেকেই ঢাকা শহরকে ঢেলে সাজানোর কথা বলছেন। আসলে ঢেলে সাজানো দরকার আমাদের ব্যবস্থাপনা। আমরা অনেক টাকা খরচ করে আগুন নেভানোর যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনছি, কিন্তু হাইড্রেন্ট বসাতে পারিনি। সেটা অনেক কম পয়সায় করা যেতো। আমাদের ফায়ার ব্রিগেডের নাম “ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স”। ফায়ার সার্ভিসটাই আছে, সিভিল ডিফেন্স নেই। সিভিল ডিফেন্সের জন্য কোনও অর্থ নেই, কোনও কার্যক্রমও নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে পুরান ঢাকার মানুষকে আমরা পুরোপুরি ভিলেন বানিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আমরা কি আসলে সচেতন? শেরেবাংলা নগর এলাকায় কতকগুলো হাসপাতাল ও সরকারি স্থাপনা আছে। এগুলোর জন্য স্পেশাল ফায়ার ফাইটিং কোনও ব্যবস্থা আছে কি? যদি দুটি ঘটনা একসঙ্গে ঘটে তখন আমরা কী করব? আমাদের কোনও উপায় নেই, পরিকল্পনা নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও উন্নত করতে হবে। ফায়ার ব্রিগেডকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।’

এমএম মতিউর রহমানফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক পরিচালক মেজর এমএম মতিউর রহমান বলেন, ‘সচেতনতার জায়গায় আমি বলতে পারি, আমাদের বাসাবাড়ির গ্যাসলাইন বা গ্যাসের বার্নারকে প্রতিনিয়ত চেক করছি কিনা? ইলেক্ট্রিকের যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করছি কিনা। আমার বাসার যে সিঁড়ি আছে সেটি দিয়ে জরুরি মুহূর্তে আমি বের হতে পারছি কিনা। সিঁড়ির মধ্যে কিংবা নিচে গোডাউনের জিনিসপত্র আছে কিনা। বাসায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র আছে কিনা। যারা কেমিস্ট বা কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করেন তাদেরকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছি কিনা। পাশাপাশি একটি দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা যাতে নিরাপদে নেমে আসতে পারি সেই সুবিধা আছে কিনা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ যারা আছে যেমন– সরকার, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদফতর, ফায়ার ব্রিগেড এবং রাজউক সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ঠিকমতো কাজ করলে আমাদের পরিবেশটা সুন্দরভাবে পেতে পারি।’       

ড. আকতার মাহমুদজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ‘আইন যেটা আছে সেটা কি আমরা মানছি? অগ্নি নিরাপত্তা আইন আছে, পরিবেশগত অ্যাক্ট আছে, কিছু রুলস আছে–  এর কোনওটাই আমরা তোয়াক্কা করি না। আমরা আবার নতুন করে চাইলাম, ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল কোনগুলো হবে তার পুনঃব্যাখ্যা। ২০১০-এ যখন নিমতলীর ঘটনাটি ঘটলো, তার পর থেকে নয় বছর ধরে ওখানকার স্থানীয় লোকজন প্রতিবছর ৩ জুন সপ্তাহব্যাপী প্রোগ্রাম করে। তারা মানববন্ধন করে, দাবি জানায়। সেই দাবির জোর কি কম ছিল? আমি তো মনে করি না, সেখানে জোর ছিল। সেখানে অনেক সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে, তাদের এই বক্তব্য সরকার কেন শুনলো না? যদি শুনতো তাহলে আজকে ওই প্রকল্প পাস হতে ২০১৮ পর্যন্ত আসা লাগে না।

‘এখন যে ঘটনাটি ঘটেছে (চকবাজারে) এরপরে আমাদের আর দ্বিতীয় চিন্তা করার কোনও সুযোগ নেই। এখানে আমাদের প্রত্যেককে সদিচ্ছা দেখাতে হবে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, সম্প্রতি বুড়িগঙ্গার পাড়ে যে উচ্ছেদ অভিযান তাতে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। সেরকম একটা সদিচ্ছা আমরা এরকম জায়গায় কেন দেখবো না?’

আরিফ হোসেনতিনি আরও বলেন, ‘জননিরাপত্তা প্রশ্নে কোনও জিনিসই আগে আসে না। অগ্রাধিকার তালিকায় জননিরাপত্তা সবার আগে। ব্যবসা তার পরে আসতে পারে। রাজউক যদি তাদের একটি আইন “মহানগর ইমারত বিধিমালা” বাস্তবায়ন করতে পারে তাহলে অনেক বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছা ভীষণভাবে প্রয়োজন এবং অত্যন্ত ত্বরিত গতিতে এই কাজে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে নিমতলী, চকবাজারের সঙ্গে আরও অনেক নাম যুক্ত হবে।’

উদিসা ইসলামকেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন বলেছেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ছাড়া অন্য কেমিক্যালগুলো গুদামজাত করার ব্যাপারে বাংলাদেশে কোনও আইন নেই। এজন্য আমরা মেয়র সাহেবের সঙ্গে মিটিংয়ে বলেছিলাম, এই বিষয়গুলোকে যদি সামনে নিয়ে আসা হয়, তাহলে একটা শর্ট টার্ম, মিড টার্ম ও লং টার্ম প্রসেস করতে হবে। নিমতলীর ঘটনায় বলা হয়েছে, কেমিক্যাল থেকে আগুন। আসলে কোন কেমিক্যাল থেকে আগুন? সেটা সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।’     

মুন্নী সাহাপুরান ঢাকা থেকে কেমিক্যালের ব্যবসা স্থানান্তর প্রসঙ্গে  বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, ‘মালিক সরতে চায় না, সরকার সরাতে চায়– এখন এই তর্কগুলো বাদ দিতে এ বিষয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। এ বিষয়ে অন্য বক্তাদের মতো আমিও বলতে চাই, হাত জোড় না করে এখন আসলে জোর (শক্তি প্রয়োগের) করার সময় এসেছে। এতে পুরান ঢাকা কেন, সব জায়গাতেই আমরা নিরাপদ বোধ করবো।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকায় যেহেতু অবকাঠামোগত সঙ্কট রয়েছে, তাই সেখানে এ ধরনের কোনও প্রতিষ্ঠান থাকার কোনও যৌক্তিকতা নেই। এ ব্যাপারে দ্বিমত করার সুযোগ নেই।’