‘বিশ্বজনীন সমস্যা সন্ত্রাসবাদ এখনি নির্মূল করতে হবে’

‘পর্যবেক্ষণে নিউ জিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলা’ শীর্ষক বৈঠকিতে আলোচকরাসম্প্রতি নিউ জিল্যান্ডে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। ৯/১১-এর পর বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের হামলা হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে কখনও বড় করে দেখা হয়নি। সে কারণেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ এখন বিশ্বজনীন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে জড়িতরাও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে আছে। এটি কোনও নির্দিষ্ট জাতি-ধর্ম-দেশের একক সমস্যা নয়। তাই এখনি এর শেকড় উপড়ে না ফেললে আগামী পৃথিবীর মানুষের জীবন বিপন্ন হওয়া অবশ্যম্ভাবী। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য এখন বিশ্ব নেতাদের উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘পর্যবেক্ষণে নিউ জিল্যান্ডের সন্ত্রাসী হামলা’ শীর্ষক বৈঠকিতে সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে এই পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। সাংবাদিক মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) বিকালে শুরু হয় বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক এই আয়োজন।

জায়েদুল আহসান পিন্টুবৈঠকির আলোচক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজের সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, ‘আমি মনে করি, নিউ জিল্যান্ডের ঘটনা একটি ‘ওয়েক আপ কল’। কারণ একসময় আমরা বামপন্থিদের চরমপন্থা দেখেছি, তারপরে ইসলামিস্টদের চরমপন্থা দেখছি। এখন শ্বেতাঙ্গের বর্ণবাদী চরমপন্থা দেখছি। ভবিষ্যতে এটা আরও বাড়ে কিনা সে বিষয়ে ভাবতে হবে এবং এটাকে দমানোর উপায় খুঁজতে হবে।’

তিনি আরও বলেন,  ‘৯/১১-এর পর বর্ণবাদী বৈষম্য বেড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের হামলা আমরা দেখেছি। যেটা বারবার বলা হচ্ছে, আগে এই ঘটনাগুলোকে আমরা বড় করে দেখিনি। এখন পশ্চিমা বিশ্বকে ভাবতে হবে, তাদের রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে তারা কতটা মানবতাবাদ ঢোকাবে, কতটা ধর্মের ও বর্ণের কাঠ কম ব্যবহার করবে। এই জায়গাটি তারা যদি নিশ্চিত করতে না পারে, এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে। ঘটতে থাকবে এই কারণে যে, এতে বর্ণবাদীরা এক ধরনের মৌন সমর্থন পেয়ে যাবে। আপনি যখন সমাজ থেকে এক ধরনের সমর্থন পাবেন, তখন এই ঘটনা আবারও ঘটাবেন। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিতে এটি প্রতিরোধের উপায় থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।’

এটিএম নজরুল ইসলামসাবেক রাষ্ট্রদূত এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সবার সঙ্গে এক জায়গায় একমত যে, বিশ্বজনীন সন্ত্রাসবাদ বেড়ে যাচ্ছে। এটিকে নিন্দা জানাতে হবে। এটি কোনও জাতি-গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে হঠাৎ একটা লোক এক জায়গা থেকে কাণ্ড করে বসে। এগুলো শ্বেতাঙ্গদের কারণে হচ্ছে তা আমি বলবো না, এগুলোর জন্য কিছু উন্মাদ আছে সব ধর্মে, সব জাতিতে, সব গোষ্ঠীতে।’

তিনি আরও বলেন,  ‘আমরা অতীতে দেখেছি, কোথাও কোথাও রাষ্ট্রই পরোক্ষভাবে এসবের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এই যে সন্ত্রাসী কাণ্ডটি হয়ে গেল, কানাডার প্রধানমন্ত্রী এক মুহূর্ত দেরি করেননি আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করতে। অন্য কোনও রাষ্ট্রের প্রধান এই কাজ করেননি। মুসলমান রক্ষার নামে গাদ্দাফি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের তার দেশে ঠাঁই দিলো। আবদুর রশিদকে সেখানে বিশাল কন্সট্রাকশন ফার্ম করতে দিল। সেই আবদুর রশিদ এখনও কোথায় আছে, আমরা জানি না। সেই গাদ্দাফিরও তো পতন হলো।’

নূর খানজঙ্গি বিষয়ক গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক নূর খান বলেন, ‘বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সন্ত্রাসবাদের কারণে যে জায়গায় গেছে এখন বিশ্ব নেতাদের ভাবা উচিত, এই ধরনের পরিস্থিতিকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, কীভাবে কমিয়ে আনা যায়। সমাজের ভেতর থেকেই তো এই জিনিসগুলোর উত্থান হয়। সুতরাং যেসব কারণে সমাজের ভেতর থেকে এই ঘৃণার সংস্কৃতি কিংবা একে অপরকে সহ্য না করার যে বিষয়গুলো দাঁড়াচ্ছে সে জায়গা থেকে ফিরে আসা দরকার। আমার মনে হয়, এক্ষেত্রে বিশ্ব জনমত এক জায়গায় দাঁড়াবে।’

মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদনিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেছেন, ‘আমি দেখছি, নিউ জিল্যান্ডের ঘটনাটিকে সবাই ইচ্ছামতো বিশ্লেষণ করছে। এখানে তথ্যের অনেক ঘাটতি আছে। বিশ্লেষণ করার জন্য যে পরিমাণ তথ্য দরকার, সেই সমস্ত তথ্য আমাদের কাছে এখনও আসেনি। এই ঘটনা সন্ত্রাসবাদ কিনা তা আমি কী দিয়ে মাপবো? আমার মাপকাঠিটা কোথায়? আমাদের বিশ্ব এমন মাপকাঠি দাঁড় করাতে সমর্থ হয়নি। স্বভাবতই মাপকাঠি না থাকলে আপনি এটাকে টেরোরিজম বলতে পারেন, হেট ক্রাইম বলতে পারেন, আরেকজন আরেকটা বলতেই পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখানে যারা ভিকটিম হয়েছেন তারা নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষ। কোন ধর্মের, কোন বর্ণের সেটি বিবেচ্য বিষয় না। এই হামলার পেছনে কী মনস্তত্ত্ব কাজ করছে? আমরা সেই মনস্তত্ত্বটিকে খোঁজার চেষ্টা করছি। হামলাকারীর ইশতেহারে দুটি জিনিসের উপস্থিতি আমি নিশ্চিত দেখতে পাই। একটি হলো জেনোফবিক, আরেকটি হলো ইসলামোফবিক।’  

গাজী আশরাফ হোসেন লিপুসাবেক ক্রিকেটার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু বলেছেন, ‘আমাদের দেশে টেস্ট প্লেয়িং দেশগুলো যতবারই আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট বা দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলতে এসেছে, আমরা তাদের সর্বোচ্চ মাত্রায় নিরাপত্তা দিয়েছি। তারপরও কোনও কোনও দেশের আচরণ খুব আপত্তিকর। যেমন– অস্ট্রেলিয়া এখানে একটি ঘটনার কারণে আকস্মিকভাবে ট্যুর বাতিল করে। সে সময় তাদেরকে কোনওভাবেই আমরা বোঝাতে পারিনি। অন্যদিকে, নিউ জিল্যান্ডের ঘটনায় আইসিসিকে দেখিনি কোনওরকম স্টেটমেন্ট দিতে। যখন সেখানে টেস্ট বাতিল হলো আইসিসি শুধু বললো, “খুব ভালো কাজ করেছো।”  এখানে কিন্তু আচরণগত বৈষম্য আছে।’

এ সময় লিপু বলেন, ‘আমাদের এখানে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে যখন খেলোয়াড়রা হোটেলে অবস্থান করেন, সেখানে গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনের জন্যও রুম দেওয়া হয়। ক্রিকেট বোর্ডের আলাদা সিকিউরিটি সিস্টেম আছে, সেটিও দেওয়া হয়। একটা ট্যুরকে ঘিরে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। এই মিটিংয়ে লজিস্টিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার পাশাপাশি, নিরাপত্তার বিষয়টিতে ভীষণ জোর দেওয়া হয়। খেলোয়াড়দের যাতায়াতের রাস্তা থেকে শুরু করে সবকিছু তদারকি হয়। কমবেশি হাজার খানেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নিয়োজিত থাকেন। এমনকি সাদা পোশাকে দর্শকদের মধ্যে গোয়েন্দা সংস্থার লোক থাকেন গ্যালারিতে। যাতে কোনওভাবে নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।’          

আসিফ আহমেদ রম্যবাংলা ট্রিবিউনের ক্রীড়া সম্পাদক আসিফ আহমেদ রম্য বলেছেন, ‘সফরকারী ক্রিকেট দলকে আমরা যেভাবে নিরাপত্তা দিই, বিদেশে গেলে ততোটা পাই না। এ বিষয়টি নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে। আমাদের সামনে বিশ্বকাপ, তার আগে আয়ারল্যান্ড ট্যুর আছে। এখন বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তাটাই বড় ব্যাপার। নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বাংলাদেশ দলকে ট্যুরে পাঠানো উচিত। নিউ জিল্যান্ডের ঘটনার পর বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে অবহেলা করার আর সুযোগ নেই।’

মুন্নী সাহারাজধানীর পান্থপথে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে এ বৈঠকি সরাসরি সম্প্রচার করেছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ দেখা গেছে এ আয়োজন। 

ছবি: নাসিরুল ইসলাম