‘মুক্তিযুদ্ধকে ভারতবাসী কীভাবে দেখে, তা লেখার চেষ্টা না করা একটা ঘাটতি’

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের ১৩তম মাসিক সাধারণ সভাকলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আশীষ কুমার দাস বলেছেন, ‘ভারতবর্ষে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ইতিহাস চর্চায় ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকাকে প্রকটভাবে দেখানো হয়। তাকে গৌরবান্বিত করা হয়। কিন্তু, তার বাইরে মানুষের কী ভূমিকা? তার বাইরে যে ভারতে কোটি কোটি মানুষ ছিল, তাদের মনে মুক্তিযুদ্ধের কি অভিঘাত তৈরি হয়েছিল? তারা মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে দেখছেন? তাদের কথাটি কিন্তু কেউ লেখার চেষ্টা করছে না। এটা আমার কাছে ভারতবর্ষীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একটা ঘাটতি মনে হয়।’

বুধবার (২৭ মার্চ) বিকালে ঢাকায় এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের ১৩তম মাসিক সাধারণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি ‘বঙ্গবন্ধুর বিচার ও মুক্তি: ভারতের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সংস্থাটির মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করা হয়।

ড. আশীষ বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ তিনটি। এক হচ্ছে, যারা স্বাধীনতা চাইছে (বাংলাদেশ), আগ্রাসী রাষ্ট্র, পাকিস্তান আর সহায়ক শক্তি ভারতবর্ষ। কিন্তু, আপনারা এটাও খেয়াল করে দেখবেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চর্চা করার আগ্রহ বাংলাদেশে অপরিসীম। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি পক্ষ পাকিস্তান মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করে না। হতেই পারে, পরাজিত শক্তি আর নিজের কথা কি লিখবে? লজ্জাও লাগে, অন্যায় করেছে, শোষণ করেছে, অত্যাচার করেছে। লজ্জার জায়গা থেকে হয়তো লেখে না, লিখতে চায়ও না, সত্যিটা বলতে চায় না।’

ড. আশীষ বলেন, ‘আরেকটা পক্ষ ভারতবর্ষ, এখানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতকাল ধরে যে চর্চা হয়েছে, আপনারা যারা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চর্চা করেন, তারা দেখবেন, আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাস্টারমশাইরা কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে মুহূর্তেই হাত তুলে জবাব দিতাম। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চর্চা করছি, আমার কাছে মনে হলো এই ‘তলার’ মানুষগুলোর কি কিছু ছিল না? সবই ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন ছুটে ছুটে? বিদেশে গেলেন, অন্যান্য রাষ্ট্রে জনমত তৈরি করলেন, তার বাইরে কিছু ছিল না? সেই জায়গা থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধের চর্চাটি করেছি ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। এটা করা দরকার বলে আমি মনে করি। আমাদের দেশে (ভারতে) মুক্তিযুদ্ধের যে তথ্য, সেগুলো কিন্তু দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চর্চা করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের আবেগ একটু ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এটা হওয়া উচিত নয়। আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চর্চাটি এমন জায়গায় চলে গেছে, যে তথ্যগুলো মোটামুটি পাওয়া যায়, সেগুলো দিন দিন দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য তরুণ প্রজন্মের এখনই সুযোগ, ভারতের শক্তির যদি অন্য মাপের কিছু থাকে, সেটা এসময় লিখে যাওয়া।’   

ড. আশীষ কুমার দাসকে এশিয়াটিক সোসাইটির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম।

সভায় সংস্থাটির মহাসচিব ডা. সাব্বির আহমেদ ও সম্পাদক মোহাম্মদ আবদুর রহিমসহ অন্যান্য সদস্যমণ্ডলী উপস্থিত ছিলেন।