রাজধানীর পোশাকের মার্কেটে বিক্রেতাদের দুর্ব্যবহারের শিকার হন নারীরা



নিউ মার্কেট (ফাইল ছবি)অনুনয় করে দোকানে নিয়ে নারী ক্রেতাদের পণ্য দেখান বিক্রয়কর্মীরা। পণ্য পছন্দ না হলে অন্য দোকানে যাওয়ার সময় অবমাননা ও তাচ্ছিল্যের শিকার হতে হয় নারী ক্রেতাদের। ‘কেন পছন্দ হলো না’, ‘এই টাকায় সুতাও পাবেন না’ বিক্রেতাদের কাছ থেকে এমন নানা মন্তব্য শুনতে হয় তাদের। এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে আক্রমণের শিকার হতে হয় বলে, কথাগুলো না শোনার ভান করে চলে আসেন নারীরা। রাজধানীর নিউমার্কেটসহ বেশ কয়েকটি মার্কেট সরেজমিনে ঘুরে ও নারী ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে সবসময় বিক্রয়কর্মীদের দোষ থাকে না। ক্রেতারাও ইচ্ছা করে ঝামেলা করেন। দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, এমন ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সেজন্য বিক্রয়কর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে।

গত শনিবার (২৩ মার্চ) বিকালে রাজধানীর নিউমার্কেট, চাঁদনীচক শপিং কমপ্লেক্স, গাউছিয়া মার্কেট, নুরজাহান মার্কেট ও ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট এলাকায় বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা হয়। তারা বিক্রয়কর্মীদের দুর্ব্যবহারের অভিযোগ করেন। সরেজমিনে দেখা যায়, গাউছিয়া ও চাঁদনীচক মার্কেটে প্রবেশের মুখে হকাররা বসেন। পোশাক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঠেলাঠেলি করে মার্কেটে ঢুকতে হয় নারীদের। ভ্রম্যমাণ হকাররা নারীদের গতি রোধ করে বলেন, ‘আপা, সবগুলো একশ’ নিয়ে যান’। এ রকম নানা ঝক্কি-ঝামেলা কাটিয়ে শপিং কমপ্লেক্সে ঢুকতে হয় তাদের।

গাউছিয়া, চাঁদনীচক ও বলাকা ভবনে নারীদের পোশাক, জুয়েলারি, প্রসাধনীসহ দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হয়। ২৩ মার্চ বেলা সাড়ে ৩টার দিকে দেখা যায়, গাউছিয়া ও চাঁদনীচক শপিং কমপ্লেক্সের মাঝে সড়কে দাঁড়িয়ে নারীদের সঙ্গে অহেতুক তর্ক করছেন হকার ও দোকানের বিক্রয়কর্মীরা। সড়কটিতে প্রবেশের ডান মুখে চাঁদনীচক। ১২ নম্বর বলাকা ভবনের নিচতলায় রফিক টেক্সটাইল ও ফয়সাল টেক্সটাইল। ফয়াসল টেক্সটাইল দোকানের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে একজন বিক্রয়কর্মী ফুটপাতে হাত বাড়িয়ে পথচারী নারী ক্রেতাদের আটকে দিয়ে তার দোকানে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। এতে বাধ্য হয়ে ফয়সাল টেক্সটাইলে প্রবেশ করতে হচ্ছে তাদের। প্রত্যেকের সঙ্গে একই কাজ করে যাচ্ছেন এই বিক্রয়কর্মী। চলে যাওয়ার সময় ফুটপাতে দাঁড়ানো বিক্রয়কর্মী প্রশ্ন করেন, ‘কোনটা পছন্দ হয়েছে? আপা নিয়ে যান।’পেছন পেছন ছোটেন, নানা অঙ্গভঙ্গি করতেও দেখা যায় তাদের। বিক্রয়কর্মীদের এমন আচারণে ক্ষুব্ধ নারীরা।

রাজধানীর মিরপুর থেকে রাবেয়া বেগম ওড়না কেনার জন্য চাঁদনীচকে এসেছেন। কয়েকটি দোকানের বিক্রেতারা তাকে খালা, চাচি বলে ডাকাডাকি করে ওড়না দেখিয়েছেন। তাবে বিক্রয়কর্মীদের এমন ডাকাডাকি তার ভালো লাগেনি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘ডাকাডাকি করে, সামনে ব্যারিকেড দিয়ে দোকানে নিয়ে যায়। পাগল করে ফেলে।’ রাবেয়া বেগমের মতো আরও কয়েকজন নারী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাবীবা হাসান বলেন, ‘বিক্রয়কর্মীরা হাসিখুশিভাবে সবসময় দোকানে আমন্ত্রণ জানান। এরপর কোনোকিছু না কিনলেই নানা মন্তব্য করেন। ক্রেতারা কোনও পণ্যের দাম বললে, তা বিক্রয়কর্মীদের মনমতো না হলে, আরও বাজে মন্তব্য করেন।’

কী ধরনের মন্তব্য করেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব অকথ্য কথা। যা বলা যাবে না। দুই একটা বলা যায়। যেমন, ‘এই টাকায় সুতাও পাবেন না। কিনতে আসছেন, না দেখতে আসছেন?’ এ ছাড়া দেখার সময় হাত থেকে পণ্য টেনে নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী।

গাউছিয়া, চাঁদনীচক ও নিউমার্কে বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ক্রেতাদের এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। গত ২২ মার্চ নিউমার্কেট থানার গাউছিয়া মার্কেটের একটি অলঙ্কারের দোকানে কেনাকাটা করতে গিয়ে মারধরের শিকার হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। অলঙ্কারের দাম নিয়ে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে ওই ছাত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ মারধর করেন একজন বিক্রয়কর্মী। এরপর তাকে ওই দোকান থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ওই দোকানের কর্মচারীদের আটক করে নিউমার্কেট থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। বিষয়টি পরবর্তীতে দোকান মালিক ও মেয়েটির পরিবার থানায় বসে মীমাংসা করে।
ভুক্তোভোগী ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘ঘটনার পর আমার পরিবারের সদস্যরা ও ইয়েলো কালেকশনের মালিক পক্ষ এসেছিল। সবার সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে মালিক পক্ষ আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। এমন ঘটনা যাতে আর কোনও মেয়ের সঙ্গে না ঘটে, সে বিষয়ে তারা সতর্কতা অবলম্বন করবে বলে মুচলেকাও দিয়েছে।’
এ ঘটনার বিষয়ে নিউমার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘যে তরুণী অভিযোগ দিয়েছিলেন, তার অভিভাবক এবং গাউছিয়ার দোকান মালিকরা থানায় বসে একটি লিখিত আপসনামা দিয়েছেন। এরপর বিষয়টি মীমাংসা করে তারা চলে গেছেন।’
ক্রেতাদের পক্ষ থেকে দুর্ব্যবহারের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন গাউছিয়া মার্কেটের নীচতলার চৈতি ফ্যাশনের প্রোপাইটর ফয়সাল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করি। ব্যবসায়ীরা খারাপ ব্যবহার করে না। ক্রেতারা একটা পণ্য পছন্দ করেন, দাম বলেন এবং প্যাকেট ভর্তি করতে বলেন। প্যাকেট ভর্তির পর ক্রেতারা বলেন, এই দামে আমি নেবো না। ফের অর্ধেক দাম বলেন। তখন কী করা উচিৎ?’
বিক্রয়কর্মীদের এমন আচারণের বিষয়ে জানতে চাইলে গাউছিয়া মার্কেট দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের ব্যবসায়ীরা কখনও ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচারণ করেন না। বিক্রয়কর্মীরাও করেন না। মার্কেটের সুনাম রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। কারণ এখানে আমরা ব্যবসা করি। ব্যবসার ভালোর জন্যই মার্কেটের ভালো পরিবেশ বজায় রাখা দরকার।’

ফরিদ উদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘প্রতিবছর বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে আমরা তিনটি সভা করি। ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করার পরামর্শ দিই। তারপরও কিছু খারাপ লোক মার্কেটে থাকে। তাদের কারণে মার্কেটের বদনাম হয়। যে ঘটনা ঘটেছে সেদিন, সেটা আমি শুনেছি। আমি ওই দোকানের বৈদ্যুতিক সংযোগ কেটে দিতে চেয়েছিলাম। পরে শুনলাম তারা থানায় গিয়ে মীমাংসা করেছে। এরপর তাকে সতর্ক করা হয়েছে।’