গোয়েন্দা পুলিশের দাবি, এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে পশ্চিম মেরুল বাড্ডা এলাকায় গাঁজা স্পট পরিচালনাকারী সাজু ও শাহ আলী। আর তাদের হত্যার নির্দেশ দেয় মেরুল বাড্ডা এলাকার গাঁজা স্পট পরিচালনাকারী মনির হোসেন ওরফে টারজান মনির।
শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় মো. সাজু মিয়াকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা উত্তর বিভাগের গুলশান জোনাল টিম। সাজুকে গ্রেফতারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে।
সাজুকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা (উত্তর) বিভাগের এডিসি গোলাম সাকলায়েন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পশ্চিম মেরুল বাড্ডায় গাঁজার স্পট চালানো ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। মেরুল বাড্ডায় গাঁজার স্পট পরিচালনা করত মনির হোসেন অরফে টারজান মনির। বিভিন্ন সময়ে টারজান মনিরের গাঁজার স্পটের সেলসম্যানদের থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। টারজান মনিরের ধারণা হয় এই গ্রেফতারের ক্ষেত্রে তার স্পটের পাশেই বসবাসকারী রেন্ট-এ-কার এর ড্রাইভার জুলহাস থানা পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।’
হত্যাকাণ্ডের আগেরদিনও ওই স্পটে হানা দেয় পুলিশ। মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেলেও সেখান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। জুলহাসের সঙ্গে মনিরের বিভিন্ন সময়ের সম্পর্ক ও আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ীর সঙ্গে জুলহাসের সম্পর্ক থাকায় তার ওপর সন্দেহ হয় মনিরের। জুলহাসকে হত্যা করার জন্য মনির তার শ্যালক শাহ আলী ও সাজুকে দায়িত্ব দেয়। এই কাজের জন্য ৫০ হাজার টাকা অগ্রিমও দেন মনির। বাকি টাকা হত্যার পর দেওয়ার কথা ছিল বলে গোয়ান্দের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে সাজু।
এডিসি গোলাম সাকলায়েন বলেন, ‘মনিরের নির্দেশে ১৮ মার্চ জুলহাসকে হত্যার উদ্দেশ্যে যায় সাজু ও শাহ আলী। সাজু প্রথমে ধরতে গেলে জুলহাস তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। তখন শাহ আলী জুলহাসকে গুলি করে এবং দৌড়ে হাতিরঝিল হয়ে পালিয়ে যায়।’
এই হত্যার সঙ্গে টারজান মনিরের কালো রংয়ের নোয়াহ ভক্সি মাইক্রোবাসের ড্রাইভার মনির ও সার্বক্ষণিক সহযোগী সরোয়ারও জড়িত রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের জানিয়েছে সাজু।
এদিকে গত ২৮ মার্চ রাত ৩টার দিকে ডিবি উত্তরের মোট তিনটি টিম মেরুল বাড্ডা এলাকায় অবস্থান নেয়। এক পর্যায়ে ঢাকা মেট্রো চ-১১-৬৫৯৫ কালো রংয়ের নোয়াহ ভক্সি মাইক্রোবাসটিকে প্রগতি সরণী হয়ে পশ্চিম মেরুল বাড্ডার দিকে প্রবেশ করতে দেখা যায়। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত ওই মাইক্রোবাসটি পথ পরিবর্তন করে আফতাব নগরের ইস্টর্ন হাউজিং এর দিকে যেতে শুরু করে।
ডিবি উত্তরের এডিসি সাজাহান সাজু বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক গাড়ি মাইক্রোবাসটিকে অনুসরণ করার এক পর্যায়ে এম ব্লক এ বরই তলার কাছে সেটি থামে। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা, অফিসার ও ফোর্স গাড়ি থেকে নামতেই মাইক্রোবাসটির ভেতর থেকে অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পলায়নরত দুইজনকে দুটি বিদেশি পিস্তলসহ গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা হাতে নাতে গ্রেফতার করে। ঘটনাস্থলে অজ্ঞাতনামা দুইজনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় আরও ২টি বিদেশি পিস্তল পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়।
এডিসি সাজাহান সাজু বলেন, ‘দুইজনকে জিজ্ঞাসা করলে জানা যায় তাদের নাম ড্রাইভার মনির ও সরোয়ার। গুলিবিদ্ধ দুইজনের পরিচয়ের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায়, একজন মাদক সম্রাট ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মনির অরফে টারজান মনির এবং অপরজন তার শ্যালক শাহ আলী।
তিনি আরও বলেন, দুজনকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করলে জানা যায় এই টারজান মনির জুলহাস হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী। টারজান মনির তার শ্যালক শাহ আলী ও তার অন্যতম সহযোগী সাজুকে দিয়ে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে।
ডিবি উত্তরের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, ‘টারজান মনির ও তার সহযোগীদের সঙ্গে থাকা মাইক্রোবাসটি তল্লাশি করে প্রায় দেড় থেকে দুই মণ গাঁজা উদ্ধার হয়। অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের এলোপাথাড়ি গুলিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের নেভী ব্লু রংয়ের একটি ডাবল কেবিন পিকআপ যার রেজি: নং-ঢাকা মেট্রো-থ-১১-৬০৬৫ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ সময় তিনজন পুলিশ সদস্য আহত হন, যাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ‘টারজান মনির মাদক স্পট পরিচালনার পাশাপাশি ছিনতাই, ডাকাতি, অস্ত্র দেখিয়ে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে একটি আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তার নামে বাড্ডাসহ বিভিন্ন থানায় খুন, অস্ত্র, ডাকাতি, চুরি, ও মাদকের ১০ টিরও বেশি মামলা রয়েছে।’
এদিকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা সাজুকে জুলহাস হত্যা মামলায় রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের অন্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিসি মশিউর রহমান।