সোহেল রানারা সামান্য বেতনে ত্যাগ স্বীকারের এত শক্তি কোথায় পান?

ফায়ারম্যান সোহেল রানা

বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় আটকেপড়াদের উদ্ধারে কাজ করছিলেন কুর্মিটোলা ফায়ার স্টেশনের ফায়ারম্যান সোহেল রানা। লেডারে করে আটকেপড়া ব্যক্তিদের নামিয়ে আনা হচ্ছিল। সোহেল রানাদের লেডারটির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ছিল ছয়জনের। সোহেল রানা এবং আরও দুজন ফায়ারম্যান এই লেডার নিয়ে আটকেপড়া কয়েকজনকে উদ্ধার করেন। কিন্তু, লেডারে জায়গা না হওয়ায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জায়গা করে দিতে সোহেল রানা উপর থেকে লেডারের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। পথে তার পা আটকে যায়। লেডার সংক্রিয়ভাবে নিচে নেমে আসার সময় সোহেলের এক পা ভেঙে কয়েক টুকরো হয়ে যায়। প্রচণ্ড চাপে পেটের নাড়িভুঁড়িও থেঁতলে যায়।

তাকে উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। সেখানে সোমবার (৮ এপ্রিল) তিনি মারা যান।

ফায়ার ফাইটার হিসেবে সোহেল রানার বেতন স্কেল ছিল আট হাজার। অন্যান্য সুবিধা মিলিয়ে টাকার অঙ্ক দাঁড়াতো ১৬-১৭ হাজারে।

বেতন বা সুযোগ-সুবিধার হিসেবে ফায়ার ফাইটারদের প্রাপ্তি অনেক কম হলেও তাদের এই অবদান ও ত্যাগ টাকার অঙ্কে মেলানো যাবে না। ত্যাগের মানসিকতা থেকেই এ ধরনের পেশায় মানুষ যুক্ত হন বলে দাবি বিশিষ্টজনদের।

ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (প্রশাসন) দেবাশীষ বর্ধন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের জানমাল রক্ষার শপথ নিয়ে আমরা এই চাকরিতে আসি। আমাদের ফায়ার ফাইটাররা অন্যের জীবন বাঁচানোর এই সাহস ও শক্তি পান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। প্রশিক্ষণের সময় তাদের মাঝে সেবার মানসিকতা গড়ে তোলা হয়।’

অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিতে পারেন এই ফায়ার ফাইটাররা। এই সাহস ও উৎসাহ আসে প্রশিক্ষণ থেকে। সেবার লক্ষ্য নিয়েই এ পেশায় তরুণরা যুক্ত হন বলে দাবি ফায়ার সার্ভিস ঊর্ধ্বতনদের।

দুর্যোগ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহর নঈম ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশে যেসব ফায়ার ফাইটার আছেন, তারা তাদের কাজটা সিরিয়াসলি নেন, ভালোভাবে করেন। বেতনভাতাটাকে তাদের এই কাজের সঙ্গে তুলনা করলে ফায়ার ফাইটাররা যে কাজ করেন, সেটাকেই অবমূল্যায়ন করা হবে। বিভিন্ন দুর্যোগে তাদের অবদান বেতন বা টাকার মূল্যে হিসাব করা যাবে না। তাদের কাজকে সম্মান করা, তাদের অবদান ও কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত।’

ফায়ার সার্ভিসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের ফায়ার ফাইটাররা অনেক দক্ষ এবং পরিশ্রমী। তাদের কাজটুকু কী, তারা তা জানেন। আমাদের এই দেশের প্রেক্ষাপটে তারা যে পরিশ্রম করেন, সেই তুলনায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। তবে, তাদের কাজের মূল্যায়নটা টাকার অঙ্কে করলে ভুল হবে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তারা ঝুঁকিটুকু নেন।

সোমবার (৮ এপ্রিল) রাত ১১টার দিকে সোহেল রানার মরদেহ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে। তার মরদেহ গ্রহণ করার জন্য পরিবারের সদস্য ছাড়াও ফায়ার সার্ভিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

সোহেলের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার চৌগাংগা ইউনিয়নের কেরালা গ্রামে। তিনি ২০১৪ সালে ফায়ার সার্ভিসে যোগ দেন।

উল্লেখ্য, ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন লাগে। সোহেল রানাসহ এই পর্যন্ত এই ঘটনায় মোট ২৭ জন মারা গেছেন।

 


আরও পড়ুন: ‘বনানীর আগুন আমাদের সব কেড়ে নিলো’