নুসরাতের বাবার স্বপ্ন ছিল একমাত্র মেয়ে একদিন বড় হবে, মানুষের মতো মানুষ হবে। পড়ালেখা শেষ করে নিজেকে উচ্চপদে নিয়ে যাবে। কিন্তু সে স্বপ্ন পূরণ হলো না। উল্টো তাকে বহন করতে হচ্ছে একমাত্র মেয়ের নিথর দেহ। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
এ সময় নুসরাতের চাচা নুরুল হুদা শামীম বলেন, ‘পুরো পরিবার নুসরাতকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ। তার বাবা কোনও কথা বলতে পারছেন না। আর নুসরাতের মা আহাজারি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। একমাত্র বোনকে হারিয়ে শোকে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন দুই ভাই। যখনই জ্ঞান ফিরছে তখনই কাঁদছেন। তারাও মেনে নিতে পারছেন না বোনের অকাল মৃত্যু। বৃহস্পতিবার সকালেও মর্গের সামনে ছিলেন দুই ভাই। কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাদের কোলে তুলে অন্য জায়গায় নিয়ে যান আত্মীয়রা।
বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে পোড়া দেহের সঙ্গে যুদ্ধ করে মৃত্যুর কাছে হেরে যান নুসরাত। মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেমে আসে শোকাবহ পরিবেশ। মৃত্যুর সংবাদটি বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল নিজেই তার বাবাকে জানান। মেয়েকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ তার মা শিরীন আক্তার। মৃত্যুর খবর শোনার পর কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ সেন্টারের আইসিইউতে (ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) রাখেন চিকিৎসকরা। সকালে তার জ্ঞান ফেরে।
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান জানান, জানাজা ও দাফনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে জানাজা শেষে দাদির কবরের পাশেই দাফন করা হবে তাকে। মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে নুসরাতের বাবা বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি আপনাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞ আমাদের পাশে থাকার জন্য। আপনারা আমার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন সে যেন বেহেশতবাসী হয়। আমি মেয়ে হত্যার ন্যায়বিচার চাই।’
এদিকে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা। পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো (উত্তর) পরিদর্শক মোস্তফা কামাল বলেন, ‘মামলার তদন্তভার পিবিআইয়ের কাছে এখন। ফেনীর টিম মামলা তদন্ত করবে। আমরা সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য এসেছি।’
এদিকে ডিএনএ (ডি-অক্সি-রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) নমুনা সংগ্রহ করেছে ময়নাতদন্তকারী টিম। ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘আজকে পুরো জাতির সঙ্গে আমরা ঢামেক পরিবার মর্মাহত। যেহেতু বিধি অনুযায়ী আমাদের পোস্টমর্টেম করতে হয় সেহেতু কার্যক্রমটি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছি। একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
ফেনীর পথে নুসরাতের মরদেহ
বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়। পাশাপাশি আলাদা একটি গাড়িতে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা। নুসরাতের লাশ বহনের ব্যবস্থা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করেছেন বলে জানিয়েছেন ঢামেক পরিচালক।
নুসরাতের চাচা নুরুল হুদা শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাদ আছর ফেনীর সোনাগাজীর পাইলট হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে নুসরাতের মরদেহ দাফন করা হবে।’