ঈদে ঢাকা হয়ে ওঠে পুনর্মিলনীর শহর

রবীন্দ্র সরোবরে মানুষের ঢলইট-পাথরের এই ব্যস্ত শহরে পরিবার ছাড়া আর কারও খোঁজ তেমন নিতে পারে না কেউ।  সপ্তাহে একদিন কিংবা দুদিন ছুটি পেলেও সেই সময় চলে যায় পরিবারের পেছনেই। তাই বন্ধু, আত্মীয়, প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা কিংবা মন ভরে আড্ডা দেওয়ার বাহানা হিসেবে উৎসবের দিনগুলোকে বেছে নেয় সাধারণ মানুষ। আর তাই ঈদকেন্দ্রিক আড্ডায় মেতে ওঠে সবাই। এতে যেন রাজধানী হয়ে ওঠে পুনর্মিলনীর শহর।

ঈদের দিন ও পরের দিন উৎসবের সাজে যেমন সাজে রাজধানী, তেমনি সাজের কমতি থাকে না মানুষের মধ্যেও। তাই রোদ-বৃষ্টির খেলার মাঝেই বেরিয়ে পড়েন অনেকেই। রাজধানীতে মানুষের বিনোদন সীমাবদ্ধ অল্প কয়েকটি জায়গাতেই। ঘুরতে ঘুরতে পরিচিত মানুষের দেখাও হয়ে যায় অনেক সময়। মানুষ ব্যস্ত হয়ে ওঠে একে অপরের সঙ্গে পুনর্মিলনে।  

ঈদের পরদিন বৃহস্পতিবার (৬ জুন) রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে পুনর্মিলনের এই চিত্র। দুপুর পর্যন্ত মানুষের আনাগোনা কম থাকলেও সূর্যের তেজ কমার পরপরই নেমেছে মানুষের ঢল। এর মধ্যে আছে– রমনা পার্ক, সংসদ ভবন, ধানমন্ডি লেক এবং খাবারের দোকানগুলো।

দুপুরের পর থেকে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে নেমেছে মানুষের ঢল। প্রকৃতি আর লেকের মাঝে কিছুক্ষণ গা এলিয়ে দিতে অনেকেই পরিবারসহ এসেছেন এই জায়গায়। কেউ ঘুরে ঘুরে লেকের চারপাশ দেখছেন, কেউবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠছেন। আবার কারও সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ায় সেরে নিচ্ছেন ঈদের কোলাকুলি।

রায়েরবাজারের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ পরিবারসহ এসেছেন রবীন্দ্র সরোবরে। সরোবরের মুক্তমঞ্চের সামনেই বসেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে আর কোথায় যাবো? যাওয়ার তেমন কোনও জায়গা নেই। গতকাল সংসদ ভবন গিয়েছিলাম। এছাড়া বাচ্চাকে নিয়ে শিশুমেলায় গিয়েছি। ঈদের ছুটিতে তো আর ঘরে বসে থাকা যায় না, তাই বেরিয়ে পড়লাম। এখানে আছি কিছুক্ষণ, এরপর হয়তো  কোথাও খেতে যাবো।’

ধানমন্ডি লেকে অনেকেই প্যাডেল বোটে করে ঘুরে সময় কাটিয়েছেন প্রিয়জনের সঙ্গেঈদকে কেন্দ্র করে আড্ডা জমে উঠেছে রাজধানীর বিভিন্ন চটপটি ও ফুচকার দোকানে। প্রায় সবখানেই দেখা গেছে তরুণ-তরুণীদের ভিড়। জায়গা না হওয়ায় অনেক আবার দাঁড়িয়েও গল্প করতে করতে খাচ্ছেন ফুচকা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হাবিব বন্ধুদের নিয়ে ফুচকা খাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ধানমন্ডিতে দুটি রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতে, কিন্তু জায়গা পাইনি। তাই এখানে আড্ডা দিচ্ছি আর ফুচকা খাচ্ছি।’

শুধু ফুচকার দোকান নয়, ভিড় ছিল ভাসমান খাবারের দোকানগুলোতেও। রবীন্দ্র সরোবরের একপাশে আছে কয়েকটি খাবারের দোকান। সেখানে কাবাব থেকে শুরু করে সবকিছুই পাওয়া যায়, কিন্তু একটি টেবিলও খালি নেই। লেকের ভেতরে মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখে কেউ কেউ আবার উঠে যাচ্ছেন ব্রিজের ওপর। সেখানে দাঁড়িয়ে চলছে আড্ডা এবং ছবি তোলার উৎসব।

ঈদের বিনোদনে যুক্ত হয়েছে প্যাডেল বোট। ধানমন্ডি লেকে অনেকেই প্যাডেল বোটে করে ঘুরে সময় কাটাছেন প্রিয়জনের সঙ্গে। প্যাডেল বোটের কাউন্টারে অনেক ভিড় ছিল। টিকেট কাটার পরও অনেককেই অপেক্ষমাণ দেখা যায়। তেমনি অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন তাহমিনা। ছোট ভাইকে নিয়ে বোটে ঘুরবেন। কিন্তু দীর্ঘ লাইন পেরিয়ে টিকেট নেওয়ার পর এখন সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছেন। প্যাডেল বোট পরিচালনায় নিয়োজিত ডিঙির কর্মকর্তারা জানান, ঈদের সময় মানুষের প্রচুর চাপ থাকে, তা সামাল দিতে হিমসিম খেতে হয়।  

লেকের বাইরে আরেক মিলনমেলা দেখা যায় সংসদ ভবনের সামনে। এখানেও সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি রয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছেন কলেজ পড়ুয়া সানি। গুলশান যাওয়ার পথে হঠাৎ নেমে গেলেন সংসদ ভবনের সামনে। বন্ধুরাসহ সেলফি তুলছেন সেখানে। তিনি বলেন, ‘কালকে বৃষ্টি ছিল, তেমন কোথাও যাওয়া হয়নি। তাই আজকে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়েছি। যাওয়ার পথে সংসদ ভবনের লাইট দেখে মনে হলো সেলফি তুলি এখানে।’