চলছে গণপরিবহনে গণনৈরাজ্য

সদরঘাটের নৈরাজ্যসদরঘাটের মূল টার্মিনালঘেঁষে প্রতিদিনই সারি সারি বাস দেখা যায়। হেলপাররা হাঁক দিয়ে যাত্রীদের ডেকে চলেন। পুরো বাস ভর্তি না হলেও গন্তব্যের উদ্দেশে একটি ছেড়ে যায় না। অভিযোগ রয়েছে, এ সব বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে মূল ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায় করা হয়। সদরঘাট থেকে গুলিস্তানের ভাড়া ১০ টাকা হলেও নেওয়া হয় ৬০ টাকা আর গাজীপুরের ভাড়া  নেওয়া হয় ১৮০ টাকা। মিরপুরের ভাড়া ৪০ টাকা হলেও নেওয়া হয় ১৫০ টাকা। চিটাগাং রোডের ভাড়া ৪০ টাকা হলেও নেওয়া হয় ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে বাসচালকরা বলছেন, এই রুটে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়েই তারা বাস চালান। তাই পুষিয়ে নেওয়ার জন্যই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন তারা। আর দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন, কোনও পরিবহন থেকেই চাঁদা আদায় করা হয় না।

গত ২১ জুন (শুক্রবার) সকালে সদরঘাটে কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো, প্রতিদিন ভোর ৪টার থেকেই সদরঘাটের চিত্র এমন থাকে। প্রতিটি বাসই কাঙ্ক্ষিত-সংখ্যক যাত্রী না নিয়ে সদরঘাট ছাড়ে না।

এ সময় আশে-পাশে পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। দেখা মিলেছে আনসার সদস্যদেরও।   

দেখা গেছে, ঢাকা-মোহনগঞ্জ, ঢাকা-দোহার, ঢাকা-নরসিংদী লেখা বাসগুলোও সদরঘাটে এসে যাত্রী নিয়ে মিরপুর, টঙ্গী, চিটাগাং রোড, গাজীপুর যাচ্ছে। এসব রুটের গাড়ি এখানে কীভাবে এলো?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সদরঘাটের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে এসব রুটের বাস সদরঘাটে আসে প্রতিদিন। এজন্য গাড়িপ্রতি চাঁদা নেওয়া হয় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। প্রতিটি সিএনজিকেও সদরঘাট এলাকায় এসে যাত্রী নিতে দিতে হয় ৪০ থেকে ৬০ টাকা। রিকশাপ্রতি নেওয়া হয় ১০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট হারের এই চাঁদা না দিলে কোনও বাস বা সিএনজিকে সদরঘাট এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এর সঙ্গে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার যোগসূত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ২১ জুন, সকালে সদরঘাটের ভিআইপি প্রবেশ পথের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্দ্ধ এক বৃদ্ধা। বরিশালের গৌরনদীর টরকি থেকে এসেছেন। যাবেন মিরপুর। ছেলের বউসহ দুই নাতি নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ছেলে গেছে মিরপুর যাওয়ার জন্য সিএনজি দেখতে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুখ কালো করে ফিরে এসেছেন ছেলে তাওহিদ। এসে মাকে জানালেন, সিএনজি মিরপুর ১০ নম্বর গোলচক্কর যেতে ভাড়া চেয়েছে ৮০০ টাকা। আর বাসে জনপ্রতি ভাড়া চেয়েছে ১৫০ টাকা করে। কোনও কিছু না পেয়ে ফিরে এসেছেন তিনি।  

সদরঘাটে টার্মিনাল ভবনের সামনে এভাবেই রাখা হয় যাত্রীবাহী বাসজানতে চাইলে তাওহীদ জানান, তিনি নিউ মার্কেটে একটি শাড়ির দোকানে সেলসম্যানের কাজ করেন। মা, স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ঈদের সময় ছুটি নিয়ে বাড়ি গিয়েছিলেন। ঈদের পর প্রায় হাতখালি করে রাজধানীতে এসেছেন কাজে যোগ দেবেন বলে। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের ১০ নম্বর গোলচক্করে বাসা। পকেটে সীমিত টাকা। বাসা পর্যন্ত পৌঁছানো যায়, এই পরিমাণ টাকা নিয়েই এসেছি। এখন দেখছি সারাপথে যা খরচ হয়নি, তার চেয়ে বেশি ভাড়া লাগছে সদরঘাট থেকে বাসা পর্যন্ত যেতে। সিএনজি ভাড়া সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা হতে পারে। কিন্তু কোনও সিএনজিই ৮০০ টাকার নিচে যাবে না। বাসের ভাড়া জনপ্রতি ৪০ টাকা হলেও তারা দাবি করছে ১৫০ টাকা করে। আমরা ৫ জন। সেই হিসাবে আমাদের ভাড়া লাগবে ৭৫০টাকা। আমি এই বাড়তি টাকা কোথায় পাবো, আর কীভাবেই বাসায় যাবো?’

অতিরিক্ত ভাড়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদরঘাট থেকে মিরপুর যাওয়ার বাস (বাসের গায়ে যদিও লেখা ঢাকা-দোহার) লাভলী পরিবহনের চালক মোবাশ্বের আলী বলেন, ‘ভোর ৪টায় এসেছি। সিরিয়াল পেলাম ৬টায়। চাঁদা দিয়েছি ৮০০ টাকা। সঙ্গে হেলপার রয়েছে। এবার আপনি বলুন, ভাড়া কত নিলে আমার পোষাবে?’ চাঁদা কাকে দিলেন—জানতে চাইলে মোবাশ্বের আলী মৃদু হেসে বললেন, ‘বোঝেনই তো।’

একইভাবে সদরঘাট থেকে গাজীপুরগামী (বাসের গায়ে লেখা সোহাগ এন্টারপ্রাইজ, ঢাকা-নরসিংদী) বাসের চালক সিরাজ মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ৩টায় এসেছি। সকাল হওয়ার আগেই একটা ট্রিপ মারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সিরিয়াল পেলাম না। ৮০০ টাকা চেয়েছিল, দরদাম করে ১০০ টাকা কম দিয়েছি বলে সিরিয়াল পিছিয়ে দিয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঢাকা শহরে থাকি। বাড়তি কিছু আয় না করলে খাবো কী? এভাবে সময় ব্যয় করে এত টাকা চাঁদা দিয়ে কত টাকা থাকবে? বেশি ভাড়া না নিয়ে চলবো কীভাবে? খরচ তো তুলতে হবে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সদরঘাটের সামনে দায়িত্বরত পুলিশের উপ-পরিদর্শক রফিক (বুকে নেম ব্যাজে লেখা) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভোর হওয়ার আগপর্যন্ত যাত্রীদের সুবিধার্থেই বাসগুলোকে সদরঘাটের কাছাকাছি যাওয়ার অনুমতি দেই। অনেক যাত্রী আছে, যারা শিশু, বৃদ্ধ ও রোগী। এছাড়া অনেক যাত্রীর কাছে লাগেজ থাকে। যা বহন করা কষ্টসাধ্য। বৃদ্ধ ও অসুস্থ যাত্রীরা পায়ে হেঁটে বাসস্ট্যান্ড যেতে কষ্ট পাবেন জেনে আমরা সকালের দিকে বাসগুলোকে ঘাটের কাছে যেতে দেই। তবে তা কোনও কিছুর বিনিময়ে নয়। এক্ষেত্রে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনও বাস চালকের কাছ থেকে চাঁদা নেই না।’

যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় প্রসঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সদরঘাট এলাকার রাস্তার শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্ব বিআইডব্লিউটিএ-এর নয়। এ দায়িত্ব পুলিশের। এ জন্য সদরঘাট সংলগ্ন রাস্তার নৈরাজ্য ঠেকাতে পুলিশ কমিশনারকে চিঠি লেখা হয়েছে। নিশ্চয়ই ডিএমপি কমিশনার এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু পরিবহন ব্যবস্থা নয়, যে কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএর কোনও কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

আরও পড়ুন:

কুলিদের কাছে জিম্মি যাত্রীরা