আসামে নাগরিক তালিকা, আদালতের হাতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

নাগরিক তালিকার পর্যালোচনা চলছে

আসামে নাগরিক নিবন্ধনের চূড়ান্ত তালিকায় যে বাংলাদেশের অবৈধ অভিবাসীরা থাকবে, সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। অনেক ‘প্রকৃত ভারতীয়রা’ও এই তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন। তালিকাটি প্রায় প্রস্তুত এবং অভিযোগের মুখে পুনরায় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এখন কোর্টের কাছেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে, কবে এই ইস্যু শেষ হবে।

এর আগে মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) এ সংক্রান্ত এক শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল— আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এনআরসির তালিকা প্রকাশ করতে হবে। এর আগে সুপ্রিম কোর্ট ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিল

২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে আসাম এনআরসি-র (নাগরিক নিবন্ধন) প্রাথমিক তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল। সেই তালিকায় আবেদনকারী ৩ কোটি ২৯ লাখের মধ্যে বাদ পড়েছিল ১ কোটি ৯ লাখ নাগরিকের নাম। নাগরিক নিবন্ধন তালিকার চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের দিন নির্ধারিত হয়েছে আগামী ৩১ জুলাই। তবে এ সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয় বলে আগেই পার্লামেন্টে জানিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই। তিনি জানান, নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হবে। শুক্রবার (১৯ জুলাই) ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে ওই আবেদন জানানো হয়। এনআরসির রাজ্য সমন্বয়ক প্রতীক হাজেলা আসামের ভয়াবহ বন্যার কারণে মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেন। এছাড়া, বাংলাদেশ সংলগ্ন জেলাগুলোতে এনআরসি-ভুক্ত নামের মধ্যে ২০ শতাংশের এবং অন্য জেলাগুলোর ১০ শতাংশ নামের পুনর্যাচাইয়ের আবেদন করে কেন্দ্র ও আসাম সরকার। 

আসামে ১৯৮৫ সালের আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী, ৬ হাজার সরকারি কর্মকর্তা ৩৬ মাস ধরে এই কাজ করছেন। আসামের প্রকৃত ভারতীয়দের তালিকা তৈরি খুবই কঠিন কাজ। তবে এই পরিস্থিতি কেন আসলো, সেটা বিশ্লেষণের আগে সুপ্রিম কোর্টের রায় কতটা ‍গুরুত্বপূর্ণ সেটা বিবেচনা করা জরুরি।

সুপ্রিম কোর্টে এই আবেদন করার কারণগুলো বেশ চমকপ্রদ। আসামের তুষার মেহতার আইনজীবী এবং ভারতের সলিসিটর জেনারেল ভেনুগোপালের হাতে বেশি সময় নেই। এছাড়া, ওই তালিকায় অনেক ভুলও থেকে গেছে।  নাগরিক নয় এমন অনেকের নামই সেখানে যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে আসামে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বারাক উপত্যকায় অনেক বাংলাদেশি রয়েছেন। এছাড়া, প্রকৃত তালিকায় অনেককে বাদ দেওয়ার গুঞ্জনও সত্যি। এমন অনেককেই বাদ দেওয়া হয়েছে, যাদের থাকার কথা ছিল। অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।

বাদী মনে করেন, এই তালিকা তৈরিতে আরও  সময় নেওয়া প্রয়োজন। এই সময়ে বারাক উপত্যকার তালিকাটি ঢেলে সাজানো দরকার। সেই তালিকাভুক্তদের মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ সদস্যের পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। সুপ্রিম কোর্ট এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। আসামের নাগরিক তালিকা নিবন্ধন কমিশনের প্রধান প্রতিক হাজেলা বলেন, ‘বিশাল এই কাজে কিছু বিষয় ‘ফসকে’ গেছে। নতুন করে সাত লাখ মানুষের এই তালিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে এক লাখের নাম। এখনও এই পর্যালোচনা চলছে।’

দেশটির প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গোগোইও আসামের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ নাম যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। তালিকা আরও সঠিকভাবে তৈরি করতে কর্মকর্তাদের দাবি আংশিক মেনে একমাস সময় বাড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি। 

আসামের বর্তমান জনসংখ্যা ৪১ লাখ। তাদের মধ্যে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া মুসলিম ও হিন্দুও রয়েছে। তাদের অনেককেই এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আসামে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ৩৬ লাখই পুনরায় আবেদন করেছেন। এখনও জানা যায়নি তাদের মধ্যে থেকে কত জনের আবেদন গ্রহণ করা হবে।

এতে করে মুসলিম ও হিন্দু বাঙালি অধ্যুষিত জেলাগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। অসমীয়া ও বাংলাভাষীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পুলিশের আচরণেও রয়েছে বৈষম্য ও হয়রানি। এগুলো বেশি হচ্ছে বারাক উপত্যকার বাইরের জেলাগুলোতে। বিশেষ করে ধুবরি, গোলপারা, কামরূপ, নাগাও, বোনগাইগাও এবং নালবাড়ি।  ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের পর সেখানে যাওয়া যেসব ব্যক্তির কাছে বৈধ কাগজপত্র নেই, তাদের ‘বিদেশি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদিকে, তালিকা থেকে বাদ পড়ায় এপর্যন্ত ৫১ জন আত্মহত্যা করেছেন। তাদের পরিবারের জন্য কোনও ক্ষতিপূরণও ঘোষণা করা হয়নি।

আসামের শিল্পমন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী বলেন, ‘২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এপর্যন্ত ৩০ হাজার বাংলাদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।  তাদের মামলাগুলো ফরেনার্স ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়েছে। বর্তমানে ৩১ শিশুসহ ১০৩৭ জন আটক রয়েছেন। তাদের কয়েকজন বছরের পর বছর আসামে বসবাস করে আসছিলেন। কর্তৃপক্ষ তাদের খাবার আর আশ্রয় দিলেও আর কিছুই দেয়নি। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ— আটক  ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না।

আসাম থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে কোনও পর্যায়ে কোনও কথা হচ্ছে না। ফলে এখানকার পরিস্থিতি মিয়ানমারের রাখাইনের মতো হতে পারে। রোহিঙ্গাদের মতো তারাও এমন এক গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হতে পারে, যাদের কেউই চায় না।

পর্যবেক্ষকরা চিন্তিত যে, ৩১ আগস্ট প্রকাশিতব্য তালিকাতেও অনেক বিদেশির নাম থাকবে, ঘুষের প্রতিফলন থাকবে, ফলে আসামের কোনও বড় নৃগোষ্ঠীই সন্তুষ্ট হবে না। বিশেষ করে অল আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন এবং অল আসাম মাইনরিটি স্টুডেন্ট— এই দুই পক্ষই অনেক অভিযোগ করেছে। এখন কোর্টের কাছেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যে, কবে এই ইস্যু শেষ হবে।