‘আহারে, মা-মরা মাইয়াডাও মইরা গেলো’

কাঁদছেন নানি ও মামি

“আহারে, একবছর বয়সেই মাইয়াডার মা মইরা গেছিল। তারপর বাপও চইলা গেছে। আমরা তারে কাছে রাইখ্যা মানুষ করতাছিলাম। হেই মাইয়্যাডাও মইরা গেলো। ওরে কত যে ‘না’ করছি—ছাদে ওঠিস না। কিন্তু ছোট্ট মানুষ। খালি ছাদে খেলতে যাইতো। আইজ সকালে আমার কাছ থিকা ১০ টাকা নিছে। বলছে, খালার বাসায় যাইবো। কিন্তু ছাদে ওইঠা খেলতে গিয়া মাইয়্যাডা নিচে পইড়া মইরা গেলো।”

কথাগুলো বলে আহাজারি করছিলেন ঝুমুরের নানি জয়নব বিবি। বিছানায় বসে কাঁদছিলেন তার মামি ফাহিমাও। বস্তির অন্যান্য ঘরের লোকজনের ভিড় সেখানে, কাঁদছেন তারাও। কারণ ৯ বছরের ছোট্ট কিন্তু ভীষণ চঞ্চল মেয়েটি পাশের নির্মাণাধীন একটি ভবনের পাঁচতলায় খেলতে গিয়ে নিচে পড়ে মারা গেছে। মর্মান্তিক এই ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানাধীন চাঁদ উদ্যানের ৭ নম্বর সড়কে। ময়নাতদন্তের পর লাশ নিয়ে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে শিশুটিকে দাফন করা হয়।

পুলিশ, স্বজন ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যানের ৭ নম্বর মসজিদ সড়কের একটি একতলা বাড়িতে নানা-নানি ও মামা-মামির সঙ্গে থাকতো ৯ বছরের শিশু ঝুমুর। আট বছর আগে মা টুনি মারা যান। এরপর বাবা সিরাজ দ্বিতীয় বিয়ে করে চলে যান। ছোট্ট ঝুমুর থাকতো নানা-মামাদের সঙ্গেই। রবিবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে নানি জয়নব বিবির কাছ থেকে ১০ টাকা নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এর আধঘণ্টা পরই খবর আসে, পাশের নির্মাণাধীন ভবন থেকে নিচে পড়ে গেছে ঝুমুর। নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচের টিনের গেট ভেঙে তাকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা। দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। কিন্তু ততক্ষণে ছোট্ট শিশুটির শরীরে আর হৃদস্পন্দন ছিল না। কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে।

সরেজমিন চাঁদ উদ্যানে ঝুমুরদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, শোকাবহ এক পরিবেশ। একতলা একটি বাড়িতে অনেকগুলো এককক্ষের রুমে একাধিক নিম্ন আয়ের পরিবার বাস করে। সদা চঞ্চল মেয়েটির অকাল মৃত্যুতে সবাই শোকাচ্ছন্ন। চিৎকার করে কাঁদছেন স্বজনেরা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামি ফাহিমা বেগম জানান, একবছর বয়স থেকে তিনি নিজের মেয়ের মতো মানুষ করছিলেন ঝুমুরকে। একটু বেশি চঞ্চল ছিল মেয়েটি। তার নিজের পাঁচ বছরের মেয়েকে নিয়ে খেলাধুলা করে সময় কাটাতো সে। এই অকাল মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না তারা।

নির্মাণাধীন এই ভবন থেকে পড়ে মারা গেছে ৯ বছরের শিশু ঝুমুর

নানি জয়নব বিবি কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হন একাধিকবার। প্রতিবেশীরা তাকে স্বান্তনা যে দেবেন, তার ভাষাও যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই প্রতিবেদকের হাত ধরে বারবার ঝুমুরকে ফিরিয়ে দেওয়ার আকুতি জানান নানি। জানান, পাশের ওই নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে ওঠতে অনেক নিষেধ করেছেন তিনি। সকালে নাতনিকে একটু ধমকও দিয়েছেন। ঝুমুর তাকে বলেছিল, ওই ছাদে ওঠবে না। ১০ টাকা চেয়েছিল। টাকা নিয়ে বলেছে, পাশের খালার বাসায় যাবে। জয়নব বিবি অনুমতি দিয়েছিলেন যেতে। কিন্তু ঝুমুর খালার বাড়িতে না গিয়ে সমবয়সী সুমাইয়া ও স্বপ্নাসহ কয়েকজন শিশু মিলে নির্মাণাধীন ওই ভবনের পাঁচ তলার ছাদে গিয়ে ওঠে। সেখানে খেলতে গিয়ে হঠাৎ নিচে পড়ে যায় সে।

ঝুমুরদের বাসার পাশেই ছোট্ট শিশু সুমাইয়াদের বাসা। এই প্রতিবেদক গল্পের ছলে কী হয়েছিল জানতে চাইলে শিশুটি জানায়, তারা একসঙ্গে ‘কুতকুত’ (গ্রামীণ খেলা, কড়ি দিয়ে মেয়েরা খেলে থাকে) খেলছিল। খেলতে খেলতে ঝুমুর পড়ে গেলে সে নিচে নেমে এসে বাসায় চলে যায়। একই ভাষ্য আরেক ছোট্ট শিশু স্বপ্নারও।

পারিবারিক ছবিতে ছোট্ট ঝুমুর

স্থানীয় লোকজন জানান, নির্মাণাধীন ওই ভবনটির ষষ্ঠ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হওয়ার পর গত একসপ্তাহ ধরে তা বন্ধ ছিল। ভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিও গিয়েছিল ছুটিতে। ভবনের নিচের টিনের গেটটি তালাবদ্ধ করাই ছিল। কিন্তু ঝুমুরদের বাসার ছাদ দিয়ে নির্মাণাধীন ওই ভবনের দোতালায় প্রবেশ করা যায়। দুই ভবনের ছাদ প্রায় লাগোয়া। তবে নির্মাণের সময় ভবনে যে নিরাপত্তা বেষ্টনী দেওয়া প্রয়োজন, তার কিছুই ছিল না ওই ভবনে। খোঁজ করে নির্মাণাধীন ওই ভবনের মালিক ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভবও হয়নি।

ঝুমুরের এই অকাল মৃত্যুতে মোহাম্মদপুর থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানার পরিদর্শক (অপারেশন) শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে খেলতে গিয়ে নিচে পড়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। তারপরও বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে।’

বাংলা ট্রিবিউনের গবেষণা বিভাগের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ১৮১ জন ‘ফল ডাউন ডেড’ বা ওপর থেকে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শূন্য থেকে ২০ বছর বয়সীদের মৃত্যুর সংখ্যা ৫৩ জন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অসাবধানতা, অসেচতনতার পাশাপাশি নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে যথেষ্ঠ নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে না। যে কারণে এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়শই ঘটে থাকে।