এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা কামরুল মাদবর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বাসায় নিহত শিশু রিয়া মনি, ফারজানা আক্তার ও নুপুর আক্তারের পরিবার থাকে। আমরা চাই, বেলুন ফোলানোর এই গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার বন্ধ হোক। গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় বেলুন বিক্রি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া দরকার। কারণ যারা মরছে তাদের সবাই শিশু। তারা খেলনা দেখলে কাছে যাবেই। কিন্তু এটা প্রশাসনের দেখা দরকার। দেশে অনেক কাজকর্ম আছে, যারা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এই গ্যাস বেলুন বিক্রি করে তাদের এগুলো বাদ দেওয়া উচিত। এর আগেও এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। আমরা নিরাপদ চলাচল ও নিরাপদ জীবনযাপন চাই।’
বেলুন বিক্রির ওই গাড়িটির বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গাড়িটা ছিল কাঠের তৈরি। চারপাশে কাঠের বেড়া (বেষ্টনী) আর ঠেলে চালানোর জন্য একটা হাতল। ওই গাড়ির মধ্যে এক পাশে গ্যাসের সিলিন্ডার রাখা, অন্যপাশে বেলুন ফোলানোর জিনিসপত্র। একটা করে বেলুন নিয়ে সেখানে ধরলেই বেলুনে গ্যাস ঢুকে যায়। ওই গাড়িতে আরও কিছু সরঞ্জাম দেখা গেছে। গাড়িটি নিয়ে ওই লোক ১১ নম্বর সড়কের গেট ঘেঁষে দাঁড়ায়। বেলুন ফোলানো দেখে শিশুরা তার কাছে যায়। আর ওই সময় রাস্তা দিয়ে কয়েকজন মানুষও যাতায়াত করে। এমন সময় ওই সিলিন্ডার বোতল বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে পাঁচজন মারা যায়। ওরা সবাই শিশু ছিল। আর যারা আহত হয় তাদের আমরা উদ্ধার করতে যাই। ওই বেলুন বিক্রেতাও আহত হয়েছে। বিস্ফোরণে কাঠের ওই গাড়িটি টুকরা টুকরা হয়ে যায়। আর সেগুলো কাছে থাকা সবার গায়ে লাগে।’
রূপনগরের শিয়ালবাড়ি বস্তিতে একটি ভাড়া ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন রুবেলের বাবা রিকশাচালক নুর ইসলাম। আগে তিনি ঢাকায় থাকলেও স্ত্রী-সন্তানরা ভোলার চরফ্যাশনে থাকতেন। গত আড়াই মাস হলো স্ত্রী পারভিন আক্তারসহ তিন ছেলেকে ঢাকায় আনেন। এই দম্পতির এক সন্তান পানিতে পড়ে মারা গেছে এক বছর আগে। এরই মধ্যে আরেক সন্তানের মৃত্যু হলো। সন্তান হারানোর শোকে নির্বাক হয়ে গেছেন মা পারভিন আক্তার।
বৃহস্পতিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে ময়নাদন্ত শেষে ৬ শিশুর মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক ও মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. কে এম মাইনউদ্দিন বলেন, সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে ছয় শিশুই শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। কারও হাত, কারও পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
ছেলে রিফাতকে নিয়ে বাড়ি যাবেন, তাই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গের গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছেন মা লাভলী বেগম। তিনি একজন গার্মেন্টস কর্মী। আর রিফাতের বাবা রোকন মিয়া একজন প্রবাসী। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ শুনেও দূর প্রবাস থেকে ছুটে আসতে পারেননি তিনি। শিশু সন্তান রিফাত (৮) রাজধানীর রূপনগরে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ব্র্যাক পরিচালিত একটি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। মর্গের সামনে রিফাতের মামা নুরুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এমনভাবে আর কোনও মায়ের বুক যাতে খালি না হয়। এই শিশুদের অস্বাভাবিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’
নিহত শিশু ফারজানা আক্তার (৭) রুপনগরের আনন্দ স্কুলের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার বাবা আবু তাহের একজন রিকশাচালক এবং মা নারগিস আক্তার গৃহিণী। পরিবারের সাত ভাই-বোনের মধ্যে ফারজানা ছোট। গ্যাস সিলিন্ডারের ঘটনায় ফারজানার বোন মরিয়ম আক্তার (৯) আহত হয়েছে।
নিহত শিশু রমজান (১১) রূপনগরের একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তার বাবা মো. আলম একটি জুতা তৈরির কারখানায় কাজ করেন। মা সোনিয়া আক্তার গার্মেন্টসে কাজ করেন। গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের কোনপাড়া গ্রামে। বর্তমানে রূপনগরের শিয়ালবাড়ী বস্তিতে থাকেন।
শিশু রিয়া মনির (৮) মরদেহ ময়নাতদন্তের পর নেত্রকোনায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানান তার বাবা মিলন মিয়া। তিনি রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি জানান, রিয়া রূপনগরের একটি স্থানীয় স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তিন সন্তারের মধ্যে রিয়া দ্বিতীয়।
এদিকে বুধবার (৩০ অক্টোবর) রাতে শিশু নিহাদ (৮) ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) মারা যায়। তার মা হালিমা বলেন, ‘এ রকম হবে কোনোদিন কল্পনা করতে পারি নাই। আমার ছেলে প্রায়ই যেতো বেলুন বিক্রেতার কাছে। এখন কী করমু, কিচ্ছু করার নাই।’
প্রসঙ্গত, বুধবার (৩০ অক্টোবর) বেলা তিনটার দিকে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগর আবাসিক এলাকায় বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়। বাকি দুই জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মারা যায়। এ ঘটনায় বেলুনওয়ালা আবু সাইদকে আটক করেছে পুলিশ। অবৈধ বিস্ফোরক দ্রব্য রাখা এবং নরহত্যার অভিযোগে তার নামে একটি মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন রূপনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ।
আরও পড়ুন: মিরপুরে বেলুনের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৬ শিশু নিহত