স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার ১২ বছর পর গ্রেফতার

111স্ত্রীকে হত্যা করে শ্বাসরোধে, আর আড়াই মাসের শিশু সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে। এরপর পালিয়ে যায়। নাম পরিবর্তন করে বিভিন্ন গার্মেন্টসে চাকরি করছিল পলাতক সেই ব্যক্তি। যে দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করেছিল সেটিও শেষ পর্যন্ত টেকেনি। তৃতীয় বিয়ে করে আরেক সংসার পেতেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। এক যুগের বেশি সময় পর ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে জোড়া খুনের এই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। তার নাম সোহেল ফকির (৩৭)।
গত ২৭ অক্টোবর সোহেলের সঙ্গে তার দুই সহযোগী আনোয়ার হোসেন ও লিটন মিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। সিআইডির ঢাকা মেট্রোর (পূর্ব) বিশেষ পুলিশ সুপার কানিজ ফাতেমা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০০৭ সালের ২৪ জুলাই গাজীপুরের কালিয়াকৈরে মৌচাক-মির্জাপুর রেলরাইনের পাশে নিয়ে স্ত্রী রত্না বেগমকে প্রথমে শ্বাসরোধে হত্যা করে সোহেল। এরপর দুই মাস ১৭ দিন বয়সী শিশুসন্তান নুরুজ্জামানকে হত্যা করে পানিতে ডুবিয়ে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালে সোহেল ফকির নিজের ঠিকানা গোপন করে গার্মেন্টকর্মী রত্নাকে বিয়ে করে। বিয়ের পর তাদের একটি ছেলে হয়। তবে সোহেল এই বিয়ের কথা গোপন করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকায় কল্পনা আক্তার নামে আরেক গার্মেন্টকর্মীকে বিয়ে করে। পরে কল্পনার অত্মীয়স্বজনরা প্রথম বিয়ের কথা জানতে পারে। এতে তারা ক্ষুব্ধ হয়। একপর্যায়ে সোহেল তার দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা লিটন মিয়া ও স্ত্রীর খালাতো ভাই আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে আগের স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করে। এরপর ২০০৭ সালের ২৪ জুলাই রত্নাকে শ্বাসরোধে আর শিশুসন্তান নুরুজ্জামানকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে। এরপর আত্মগোপনে চলে যায় সে। ঘটনার পরদিন ২৫ জুলাই পুলিশ মা-ছেলের লাশ উদ্ধার করে।
তদন্ত সূত্র জানায়, রত্না হত্যার ঘটনায় তার বাবা আব্দুল লতিফ মোল্লা বাদী হয়ে ঢাকা রেলওয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ৭, তারিখ ২৭ জুলাই ২০০৭। কিন্তু আসামির স্থায়ী কিংবা অস্থায়ী কোনও ঠিকানা জানতে না পারায় রেলওয়ে পুলিশ মামলাটির চূড়ান্ত রিপোর্ট (এফআরটি) দাখিল করে। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষের নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি সিআইডিকে অধিকতর তদন্ত করার নির্দেশ দেন আদালত।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মামলাটির নথিপত্র হাতে পায় সিআইডি। একযুগ আগের এই মামলার নথিপত্রে শুধু মামলার এজাহার ও রেলওয়ে পুলিশের দেওয়া এফআরটির একটি কপি ছিল। সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে মামলাটির অধিকতর তদন্ত শুরু করে।
যেভাবে গ্রেফতার
মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তারা মামলার বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সোহেলের একটি ছবি সংগ্রহ করে। পরিবারের সদস্যরা সোহেলের গ্রামের ঠিকানা পুরোপুরি না দিতে পারলেও কিছুটা ধারণা দেয়। ওই ধারণা থেকেই তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ময়মনসিংহের নান্দাইল থানার চরশ্রীরামপুরে গিয়ে সোহেলের মা-বাবাকে খুঁজে বের করে। পরবর্তীতে সোহেলের একটি মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। ওই নম্বরের সূত্র ধরে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার কানিজ ফাতেমা বলেন, ‘একযুগ ধরে সোহেল আত্মগোপনে ছিল। নিজের নাম পরিবর্তন করে ভাই কামরুল হাসান ফকিরের নাম নিয়ে নিজের আইডি কার্ডও বানিয়েছে। অবস্থান শনাক্তের পর ২৭ অক্টোবর তাকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে তার দুই সহযোগীর নামও প্রকাশ করলে তাদেরও গ্রেফতার করা হয়।’
পুলিশ কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা জানান, গ্রেফতার হওয়া তিন জনই হত্যাকাণ্ডের কথা আদালতে স্বীকার করেছে। মামলাটির দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।