জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালু ফর মানি’ অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ অনিয়মকে নিয়ম করতে চান। এটা হবে না।’
মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে ‘ট্রেনিং অন পাবলিক প্রকিওরমেন্ট অ্যান্ড প্রাকটিসেস ফর এসিসি অফিসিয়াল’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন তিনি।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান আত্মস্থ করে নিজ কর্ম প্রক্রিয়ায় তা নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা। তা না-হলে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদের কাঙ্ক্ষিত সক্ষমতা বৃদ্ধি হয় না।’
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে বললে বলা যায়,এর (প্রশিক্ষণ) মাধ্যমে অর্থের অপব্যয় এবং মূল্যবান কর্মঘণ্টার অপচয় হয়। তাই প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি কিছুটা হলেও হতাশ। কারণ, আমাদের কর্মকর্তাদেরকে কমিশনের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশ-বিদেশে অনেক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে হয়তো সক্ষমতাও বৃদ্ধি হয়েছে কিন্তু ব্যবহারিকভাবে এর সম্পূর্ণ প্রয়োগ হচ্ছে বলে আমরা অনুভব করছি না।’
কমিশনের প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের মহাপরিচালকের উদ্দেশে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এই ট্রেনিং সেশন থেকেই ট্রেইনি কনফিডেনশিয়াল রিপোর্ট প্রবর্তন করবেন। এই রিপোর্টে প্রশিক্ষণকালে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের প্রতি একাগ্রতা, জানার ইচ্ছাসহ সার্বিক পারফরমেন্স লিপিবদ্ধ থাকবে, যা কমিশনের সচিবের মাধ্যমে কমিশনে উপস্থাপন করতে হবে। এসব প্রশিক্ষণের মূল্যায়নের মানের সঙ্গে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, বিদেশে প্রশিক্ষণ লিংক করা হবে। কারণ, জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভ্যালু ফর মানি আমরা অবশ্যই বিবেচনা করবো।’
তিনি বলেন, ‘ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম-দুর্নীতি-দীর্ঘসূত্রতা-প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, বরাদ্দ বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে নানা অভিযোগ আমরা পেয়ে থাকি। এগুলোর সঠিকতা, স্বচ্ছতা ও পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান এবং তদন্তের জন্য দুদক কর্মকর্তাদের পাবলিক প্রকিওরমেন্ট আইন ও বিধি-বিধান সঠিকভাবে জানার কোনও বিকল্প নেই। না জানার কারণে কোনও অবস্থাতেই একজন সৎ মানুষ যেন মামলার আসামি না হন। এ ব্যাপারে আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে। ক্রয় প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার- প্রকৌশলী-প্রকিওরমেন্ট এন্টিটির যে বা যারা এই প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করেছেন, কেবল তিনি বা তারাই জবাবদিহি করবেন। অন্য কেউ নন। আমাদের কারও ভুলে যেন কোনও মানুষের সম্মান হানি না হয়।’
কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ইকবাল মাহমুদ আরও বলেন, ‘আইনি ক্ষমতার প্রয়োগ করবেন, কিন্তু অপপ্রয়োগ যেন না হয়। মনে রাখবেন আইন সবার জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য।’
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, বরাদ্দ বৃদ্ধি এগুলো আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী করার সুযোগ রয়েছে। তবে কখনও কখনও আইন ও বিধি-বিধান লঙ্ঘন করে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি, কিংবা বরাদ্দ বৃদ্ধি করে সময় মতো জনকল্যাণ হয় না। সময় মতো প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে জনগণ প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কীভাবে দুর্নীতি হয়, তা আমরা কিছু কিছু জেনেছি। কেউ কেউ অনিয়মকে নিয়ম করতে চান। এটা হবে না। প্রজেক্ট প্রোফাইল থেকে শুরু করে এস্টিমেশন এবং সর্বোপরি প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত বিধি-বিধান অনুসারে সম্পন্ন করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়গুলো আপনারা জানবেন এবং এ জাতীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করবেন। এসব অনুসন্ধান বা তদন্তের মাধ্যমে কর্ম প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো চিহ্নিত করার সুযোগও রয়েছে। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করতে কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারকে অনুরোধ জানানোর আইনি ম্যান্ডেটও কমিশনের রয়েছে। সবাই হয়তো অনুধাবনও করেন, বিজনেস প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিং না করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন। শুধু মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে সব সমস্যার হয়তো সমাধানও করা যাবে না।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখ্ত, সেন্ট্রাল প্রকিওরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের মহাপরিচালক মো. আলী নূর, দুদকের প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ কে এম সোহেল ও সিপিটিইউ’র পরিচালক শীষ হায়দার চৌধুরী।
মঙ্গলবার শুরু হওয়া এ প্রশিক্ষণ শেষ হবে ১ ডিসেম্বর। কমিশনের পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক ও উপসহকারী পরিচালক পদমর্যাদার ৪০ জন কর্মকর্তা এ প্রশিক্ষণে অংশ নেন।