প্রতিবন্ধীদের নিয়ে প্রচলিত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান




‘অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মক্ষেত্র: প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার’ শীর্ষক বৈঠকিতে আলোচকরাপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অক্ষম, কাজ করতে পারবেন না কিংবা তাদের জন্ম সময় ভুতের আছর হয়- সমাজে প্রচলিত এসব ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি তাদের উন্নয়নে রাষ্ট্র, সমাজসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মক্ষেত্র: প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন বক্তারা।

সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদপ্রতিবন্ধীদের বিষয়ে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা ও অপব্যাখ্যার পরিবর্তন জরুরি উল্লেখ করে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ বলেন, পরিবার ও সমাজে প্রতিবন্ধীদের কথা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, এটি প্রকাশ হলে সামাজিকভাবে তাদের স্ট্যাটাস কমে যেতে পারে বা সামাজিকভাবে তারা হেয় হতে পারে। এসবের বিপরীতে সচেতনতামূলক প্রচারণা জরুরি। সেমাজের মানুষকে বোঝাতে হবে, যে প্রতিবন্ধী বিষয়টি কোনও ‘ভুতের আছর’ নয়, এটা কোনও ‘পাপের ফসল’ নয়, এটা কোনও অস্বাভাবিক ঘটনাও নয়। যেকোনও ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হতে পারে। তাদের সাপোর্ট দিতে সবাইকে বিশেষ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক কে এ এম মোর্শেদবেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি বিভাগের পরিচালক কে এ এম মোর্শেদ বলেন, আমরা ভুলে যাই যে আমরা সাময়িকভাবে সক্ষম। ছোটবেলায় আমরা অক্ষম ছিলাম, আমাদের সহায়তা লাগতো। আমরা যখন বুড়ো হবো তখনও আমাদের সহায়তা লাগবে। মাঝখানের একটা সময় আমরা সাময়িক সক্ষম। যেহেতু আমরা এই বিষয়টি বুঝি না, বুঝতে চাই না, সেজন্য প্রতিবন্ধিতা একটা বড় সমস্যা।

তিনি আরও বলেন, কিছু প্রতিষ্ঠান এখন শক্তিশালী হয়েছে। আমরা ব্র্যাকে পানি ব্যবহার করি ‘মুক্তা’। সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হয় প্রতিষ্ঠানটি। এখন আমরা একটা জায়গায় এসেছি, সবসময় পাওয়া নতুন চাওয়ার জন্ম দেয়। একটা সময় ছিল, যখন সাদা ছড়ি দিবস খুব জোরেশোরে পালন হতো। তখন আমাদের এটাই একমাত্র চাহিদা ছিল। এখন ওই স্তর শেষ। এখন আমাদের মানসিক সমস্যার জায়গা হলো- ‘আমার হাত পা আছে, আমি চাকরি পাই না, উনি কেন চাকরি পাবে?’ এটা এভাবে চিন্তা করে না যে উনি এবং আমি একই দেশের নাগরিক, যে সংবিধান আমাকেই সমতার গ্যারান্টি দেয়, সেই সংবিধানের একই ধারায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেও ওই গ্যারান্টি দেয়। আমরা কিন্তু এখন অধিকার নিয়ে কথা বলছি। এখানে ভুল বোঝার সুযোগ নেই। কারণ কাজ হচ্ছে। আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।

সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের থিমেটিক এক্সপার্ট জাহাঙ্গীর আলমপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে সবার আগে মানুষ হিসেবে ভাবার আহ্বান জানিয়ে সেন্টার ফর ডিজঅ্যাবিলিটি ইন ডেভেলপমেন্টের থিমেটিক এক্সপার্ট জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সবার আগে মানুষ। তাকে সাধারণ মানুষ হিসেবে চিন্তা করার মানসিকতা এখনও আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে মানুষ হিসেবে মানুষের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। এজন্যই যে, ব্যাকরণে একটি শব্দ আছে প্রতিবন্ধী, ইংরেজিতে ডিজঅ্যাবলড। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন হয়ে গেছে যে, ‘অ্যাবলড’ মানে হচ্ছে যারা প্রতিবন্ধী নয়, কোনও অঙ্গহানি নেই বা কোনও প্রতিবন্ধকতা নেই। কিন্তু অ্যাবল এর সঙ্গে ডিআইএস এই তিনটি বর্ণ যুক্ত হলেই আমরা তাদের অক্ষম মনে করি।

প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করা এই এক্সপার্ট আরও বলেন, আমরা জানি বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব, সবই বলছে যে ১০ ভাগ মানুষ কোনও না কোনোভাবে প্রতিবন্ধী। প্রথমত, আমরা মানুষ, আমরা এই দেশেরই নাগরিক। পরিবার থেকে রাষ্ট্র প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আমার দায়িত্ব আছে, নিজেকে উপস্থাপন করার। সেখানেই আমরা বাধাপ্রাপ্ত হই। প্রতিবন্ধী মানুষকে মেডিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয় যে- উনি অক্ষম, তার অঙ্গহানি আছে, তার দ্বারা কাজ করা সম্ভব না। ফলে আমরা এখনও দেখি, অনেক জায়গায় নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী দেখলেই সিভি দেখে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। আমি নিজে গত সপ্তাহে ব্যক্তিগত লোনের জন্য আবেদন করি। সেখানে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে গ্যারান্টার উল্লেখ করায় আমার লোন রিজেক্ট হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এখনও আমার এই যুগে এসে প্রশ্ন, আসলেই কি আমি মানুষ নাকি প্রতিবন্ধী? এখনও আমরা নিজেকে সমাজে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুদ্ধ করছি।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মতিউল ইসলামবিভিন্ন পরিবহন টার্মিনালে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য বিভিন্ন টার্মিনালে বিশেষ ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই পরিবহনে উঠতে পারেন। সদরঘাটের দুটি টার্মিনালে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধার জন্য দুটি র‍্যাম্প আছে। এতে তারা নিজেই লঞ্চে উঠতে পারবেন। টার্মিনালে তাদের জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধাও আছে, যেমন: টয়লেট। পুরুষ এবং নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা আছে। সেখানেও এমন ব্যবস্থা করা আছে যাতে প্রতিবন্ধী কোনও যাত্রী নিজেই তা ব্যবহার করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, সদরঘাট টার্মিনালে প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক ব্যক্তিদের সুবিধার জন্য যোগাযোগের নম্বর দেওয়া আছে। তাদের জন্য হুইল চেয়ারের প্রয়োজন হলে ওই নম্বরে ফোন দিলেই নিয়ে আসবে। সাপোর্ট দেওয়ার জন্য লোকও চলে আসবে। পাশাপাশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য আমাদের মাইকের ব্যবস্থা আছে। সদরঘাটে সাধারণত দুপুরের পর থেকে লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। সে কারণে আমরা তখন থেকে মাইকিং করে থাকি।

বিভিন্ন পরিবহন টার্মিনালে এসব সুবিধা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমের বিষয়ে মিডিয়ায় আরও প্রচার দরকার। সদরঘাটে এসব সুবিধা দেওয়ার আইডিয়া ব্র্যাকের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল। আমরা তখন চেয়ারম্যান, মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রতিমন্ত্রীসহ বসে টার্মিনালকে কীভাবে সর্বসাধরণের জন্য যাত্রীবান্ধব করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। সব মিলিয়ে আমাদের ১৫ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছিল। আগে থেকে শুরু করলে হয়তো এত খরচ হতো না। তবে আমাদের নতুন আরও যেসব টার্মিনাল হচ্ছে সেখানে আগে থেকেই এসব সুবিধাযুক্ত করে রেখেছি।

বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ মহসিনসমাজের উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ মহসিন। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, যে প্রতিবন্ধী মানুষ সমাজের বোঝা। আমরা কিন্তু কারও করুণা চাই না, সহযোগিতা পেলে আমরা অনেক কিছু করতে পারি।

তিনি আরও বলেন, সহযোগিতা পেলে আমরা যে অনেক কিছু করতে পারি, তার বড় উদাহরণ হচ্ছি আমি। ২০১০ সালে থেকে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ক্রিকেট চালু করি। ২০১৪ সালে তাজমহল ট্রফি জিতে আসি বাংলাদেশের হয়ে। আমি কোনোদিন কল্পনা করিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে এত দ্রুত ট্রফিটি নিয়ে যেতে পারবো। আমাদের সঙ্গে কিন্তু প্রতিবন্ধীরাই খেলছে।

নিজেকে প্রতিবন্ধী মনে করেন না জানিয়ে মহসিন বলেন, আমি এখন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করছি, সারা বাংলাদেশে আমার ছয়টি ক্লাব আছে। আমরা এখন পর্যন্ত পাঁচটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেছি। এর মধ্যে তিনটিতে চ্যাম্পিয়ন ও দুটিতে রানার আপ হয়েছি। আমার এখানে সার্থকতা হলো, সেই সাতক্ষীরা থেকে দুটি ছেলে একা চলে এসেছে ঢাকায়। তাদের কোনও সাপোর্ট লাগেনি। সুতরাং আমাদেরকে যদি সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমরা অনেক কিছুই করতে পারবো।

বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজ জীবন নিশ্চিত করতে সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক হারুন উর রশীদ। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আসলে ‘ডিজঅ্যাবলড’ বা ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটি কার জন্য? সে তো সমাজের জন্য প্রতিবন্ধী না। আসলে তাদের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে, তারা প্রতিবন্ধকতার শিকার। এসব সমস্যা দূর করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, আমরা যাদেরকে প্রতিবন্ধী বলার চেষ্টা করি, তারা আসলে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন মানুষ। আমি মনে করি তারা ‘স্পেশালি অ্যাবলড’। কোনও কোনও শিশু কিংবা ব্যক্তি আমার কাছে মনে হতে পারে ডিজঅ্যাবলড। তারও যে যোগ্যতার একটি জায়গা আছে, সেটা খুঁজে বের করলে দেখা যাবে, সে আরও বেশি যোগ্যতা সম্পন্ন। তার ওই যোগ্যতার জায়গাটি খুঁজে বের করাই মূল কাজ। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের, সমাজের, ব্যক্তির কাজ করতে হবে।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যে কাজে যোগ্যতা সম্পন্ন তাকে সেই কাজ করার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হারুন উর রশীদ বলেন, মানুষকে ৫০ হাজার কিংবা এক লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়, এটি কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন যে যার অবস্থান থেকে কাজ করতে পারেন। যেমন- সে যদি শিখতে চায়, তার শেখার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সে যদি চলাফেরা ও কাজ করতে চায় তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

সমাজের স্বাভাবিকতা ও অস্বাভাবিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, আমরা স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক কাকে বলি? আমরা সমাজে যা সচরাচর বিষয়টি দেখি, তাকেই আমাদের স্বাভাবিক মনে হয়। সেক্ষেত্রে আমাদের ১০ শতাংশ লোক বাকি ৯০ শতাংশের চেয়ে সক্ষমতা বা দক্ষতায় আলাদা। কেউ অক্ষম কেউ সক্ষম আমি সেটা বলছি না। ওই ১০ শতাংশ লোক সংখ্যায় কম বলে মনে হচ্ছে সে বোধহয় অক্ষম, কিন্তু বিষয়টি তা নয়। তার যোগ্যতা তার জায়গায়, তার সেই যোগ্যতা ও কাজের জায়গা নির্ধারণ এবং এর দায়িত্ব রাষ্ট্রের, ব্যক্তির, সমাজের। তিনি আরও বলেন, আমার যখন বয়স হবে তখন আমার আরামদায়ক চেয়ারে বসতে সমস্যা হবে, আমাকে তখন কাঠের চেয়ার দেওয়া হবে। এটাই হচ্ছে অন্তর্ভুক্তিমূলক, সেই জায়গাটি তৈরি করা দরকার।

মুন্নী সাহাব্র্যাকের সহযোগিতায় ও মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় রাজধানীর পান্থপথে অবস্থিত বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিও থেকে বৈঠকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজ ও বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক ও হোমপেজে লাইভ সম্প্রচার করা হয়।