মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৬ সালের ১ জুলাই জঙ্গিরা গুলশানে নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। দুই পুলিশ সদস্যকেও নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। ওই ঘটনার বছরই আমাদের কাউন্টার টেরোরিজম গঠন করা হয়। আমাদের অপারেশন সক্ষমতাও ওই বছর বাড়ে। এই মামলার তদন্ত আমাদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, যারা প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকারী, তারা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ঘটার পর এর পেছনে আর কেউ আছে কিনা, তা খুঁজে বের করা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। এই সময়ে আমাদের দক্ষতার কিছুটা ঘাটতি ছিল। কিন্তু সহকর্মীদের দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আমাদের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি।’
সিটিটিসি-প্রধান আরও বলেন, ‘জঙ্গিরা যে কেবল হলি আর্টিজানে হামলা করবে বা শুধু প্রস্তুতি নিয়েছিল, তেমন নয়। তাদের আরও বড় পরিকল্পনাও ছিল। আমাদের তদন্তের একপর্যায়ে আমরা জানতে পেরেছিলাম, তারা এ ধরনের আরও বড় নাশকতার পরিকল্পনা করছে। প্রস্তুতিও নিয়েছিল। হামলা বাস্তবায়নে প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছিল। আমরা ২০১৬ সালের শেষের দিকে অভিযান শুরু করি। প্রথমে কল্যাণপুরে অভিযান হয়। সেই অভিযানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখান থেকে এক আসামিকে জীবিত গ্রেফতার করি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই মামলার ফাউন্ডেশন খুঁজে পাই। তার ওপর ভিত্তি করেই ওই বছরের পরের মাসে অর্থাৎ ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে নারায়ণগঞ্জে মূল মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরীর আস্তানায় অভিযান চালানো হয়, সেখানে সে সহযোগীসহ নিহত হয়। ওই জায়গা থেকে আমরা কিছু এভিডেন্স সংগ্রহ করি। পরে আজিমপুর, রূপনগরে তাদের মাস্টার ট্রেইনার (মেজর জাহিদ) নিহত হয়। আমাদের অভিযানগুলো সফল ছিল। এর বাইরেও বেশ কিছু অভিযান চালাই। ফলে এসব জায়গা থেকে লিংকগুলো বের হয়ে আসে। হামলার মূল চিত্রটা পেয়ে যাই। আমরা গণমাধ্যমের কাছে কৃতজ্ঞ। অনেক প্রতিবেদন থেকে কিছু কিছু সহায়তা পেয়েছি। সেগুলো আমরা নিয়েছি। এভাবে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাই।’
মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পাঁচ হামলাকারী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। পরে তদন্তের সময় বিভিন্ন অভিযানে আরও আট জন নিহত হয়। যাদের ভেতরে সাত জন সিটিটিসি’র অভিযানে এবং একজন র্যাবের অভিযানে মারা যায়। আরও জীবিত আট জনকে আমরা চিহ্নিত করি। এরমধ্যে ছয় জনকে গ্রেফতার করি। ওই ছয় জন ও দুই জন পলাতকসহ মোট আট জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করি। এরমধ্যে পরবর্তী সময়ে ২ দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশে সোপর্দ করে র্যাব। তাদের মধ্যে সাত জনকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একজনকে খালাস দিয়েছেন।’
নব্য জেএমবি গঠনের পরপর তাদের পুরো সংগঠনকে পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে নেতৃত্বশূন্য করা হয়েছে উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘নব্য জেএমবির যে সক্ষমতা বেড়ে উঠেছিল, সেটি আমরা বলতে পারি, তাদের মূল যে নেতা ছিল, তারা আমাদের অভিযানেই নিহত হয়েছে। প্রথম এই দলের মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী, সে নারায়ণগঞ্জে নিহত হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের কথিত আমির হয় মইনুল ইসলাম মুসা। সে আমাদের মৌলভীবাজারের অভিযানে নিহত হয়। এরপর বাশারুজ্জামান চকোলেট নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সে ২০১৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অভিযানে নিহত হয়। এরপর দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল কামরুল ইসলাম শাকিল ওরফে হারিকেন। তাকে আমরা গ্রেফতার করেছি। সে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। সে হলি আর্টিজানের সময় নেতা ছিল না। সে হলি আর্টিজানে হামলার বিষয়ে কিছু জানতো না। এরপর দায়িত্ব পায় আকতার হোসেন নিলয়। সে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছে। সর্বশেষ যে ব্যক্তি নব্য জেএমবির দায়িত্ব নিয়েছে, তাকে আমরা চিহ্নিত করেছি। সে নারায়ণগঞ্জে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ফলে নব্য জেএমবির যে নেতৃত্ব বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে উঠেছে, তাদের বিভিন্ন অভিযানে গ্রেফতার করেছি। কিছু কিছু জঙ্গি অভিযানে নিহত হয়েছে। জীবিতদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। হলি আর্টিজানে হামলা মামলার রায় সন্ত্রাসীদের জন্য একটি মেসেজ।। বাংলাদেশের মানুষের যে ধারণা ছিল, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কিন্তু এখানে দ্রুত সময়ে রায় হয়েছে। সন্ত্রাসীদের বিচার অন্য দেশেও এত কম সময়ে হয় না। বড় বড় ঘটনায় অন্যান্য দেশে সন্ত্রাসীরা সবাই মারা যায়। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করে পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আমাদের সময় লেগেছে। এজন্য আমাদের অফিসাররা পরিশ্রম করেছেন। এটি সিটিটিসির একার সাফল্য নয়। এটি বাংলাদেশ পুলিশের সাফল্য। এতে গোয়েন্দা সংস্থাও সহযোগিতা করেছে। আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’
জঙ্গি বড় মিজান খালাস পাওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনও আপিল করা হবে কিনা?—জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেবো।’ তদন্তে ঘাটতির কারণে সে খালাস পেয়েছে কিনা, তা রায়ের পূর্ণ কপি পাওয়ার পর জানা যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।