আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
রায় ঘোষণাকালে আদালত বলেন, ‘মূল এজাহার গ্রহণ না করে সাদা কাগজের ওপর সই করা এবং পরে ওই সাদা কাগজে এজাহার টাইপ করে তা রেকর্ডভুক্ত করার বিষয়ে ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুরুতর। যা দণ্ডবিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ কারণে ওই ধারা দুটি দুদক আইন ২০০৪-এর তফসিলভুক্ত অপরাধ। তাই রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং এ সংক্রান্ত নথি দুদকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হলো। একই সঙ্গে নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেওয়া হলো।’
আদালত আরও বলেন, ‘ওসি শাকিলের বিরুদ্ধে অধীনস্থ পুলিশ সদস্যসহ একাধিক ব্যক্তি, এমনকি তার নিজ শাশুড়িও বিভিন্ন অভিযোগ করে পুলিশের আইজি বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন। এসব অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হলো।’
গত ১১ জুন পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়ার একটি ইটভাটা থেকে পুঠিয়া উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৮ জুন জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নুরুল ইসলামের সমকামিতার বদ অভ্যাস ছিল। এলাকার এক কিশোরকে তিনি এ কাজে বাধ্য করতেন। ১০ জুন রাতেও নুরুল ইসলাম ওই কিশোরের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হন। একপর্যায়ে ওই কিশোর তাকে ইটের আঘাতে হত্যা করে। তাই ওই কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
তবে নিহতের পরিবার বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ তুলে দাবি জানায়, গত ২৪ এপ্রিল উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নুরুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ নির্বাচনে পুঠিয়া থানার ওসি ক্ষমতার অপব্যবহার করে নুরুলকে পরাজিত করান। ফলে সাধারণ সম্পাদক হন আবদুর রহমান পটল। এ ফলাফলের বিরুদ্ধে নুরুল ইসলামসহ পরাজিত তিনজন প্রার্থী আটজনকে আসামি করে আদালতে মামলা করেন। আদালত শ্রমিক ইউনিয়নের সব কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। নুরুল ইসলাম যে রাতে খুন হন সেদিনই আদালতের জারিকারক উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে গিয়ে আদালতের এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তার সঙ্গে নুরুল ইসলামও ছিলেন। তখন আসামিদের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। এরপর রাত সাড়ে ৮টা থেকে নুরুল ইসলামের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন সকালে ইটভাটায় নুরুল ইসলামের লাশ পাওয়া যায়।
এ ঘটনার পর নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা নির্বাচনি মামলাটির তিনজন আসামিসহ মোট পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে পুঠিয়া থানায় একটি হত্যা মামলার এজাহার দেন। তখন ওসি সেটি সংশোধন করতে বলেন। নিগার সুলতানা ওসির কথামতো সংশোধন করে ওই পাঁচজনকে সরাসরি আসামি না করে ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে তাদের নাম উল্লেখ করেন। এরপর সেটা ওসিকে দিলে তিনি ‘দেখছি’ বলে নিগারকে বাসায় চলে যেতে বলেন। কিন্তু নিগার সুলতানার এজাহার মামলা হিসেবে রেকর্ড করেননি ওসি।
নিহতের শ্যালক মাসুদ রানার দাবি, ওসি শাকিল উদ্দিন আহমেদ নিগার সুলতানার কাছ থেকে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে রেখেছিলেন। সেই কাগজেই পরবর্তী সময়ে মামলার এজাহার করা হয়। এতে কারও নাম নেই। সেই মামলাটিই এখন তদন্ত করছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। এ মামলাটিতেই এক কিশোরকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
এরপর এ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে গত ৮ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন নিহতের মেয়ে নিগার সুলতানা। সে রিটের শুনানি নিয়ে আদালত ঘটনাটির বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন।
পরে বিচার বিভাগীয় তদন্তে শ্রমিকনেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার এজাহার বদলে ফেলার অভিযোগের সঙ্গে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জড়িত উল্লেখ করে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এছাড়াও ওই প্রতিবেদনে জেলা পুলিশের তিনজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পুঠিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও থানার ইন্সপেক্টরকে (তদন্ত) দায়ী করা হয়।
আরও পড়ুন: মামলার এজাহার বদল: পুঠিয়া থানার ওসির বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ