তবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর্যবেক্ষণ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি ঘটনার সময় আশপাশে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল। গত ২০ ডিসেম্বর রাতে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের ৬০ সদস্য বিশিষ্ট আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকে পদবঞ্চিতদের একটি অংশ বিক্ষোভ শুরু করে। যারা সদ্য ঘোষিত কমিটির বিরোধিতা করে আসছে।
এই বিরোধিতা ও ক্ষোভ থেকে পদবঞ্চিতরা দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, বঞ্চিতরা নিজেদের ক্ষোভের কথা জানানো ও বর্তমান কমিটির সদস্যদের অসহযোগিতার পাশাপাশি নেতৃবৃন্দকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার জন্য দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে।
তবে এসব ককটেল বিধ্বংসী নয়। বিস্ফোরিত ককটেলগুলো শব্দ সৃষ্টিকারী বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘যেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটেছিল, সেগুলো ককটেল, আইইডি না। এগুলো শুধু শব্দ করে। তবে আমরা অচিরেই এসব বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।’
তবে এসব ঘটনায় পদবঞ্চিতদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন ছাত্রদলের আংশিক কমিটি ঘোষণার পর প্রতিবাদকারী ছাত্রদল নেতা রাশেদ ইকবাল খান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছাত্রদলের কমিটিতে পদ পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানোর কোনও সম্পর্ক নেই। কমিটি হওয়ার পর দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা এখন আর এ সমস্ত পদ পদবি নিয়ে ভাবছি না। আমাদের প্রতি হাইকমান্ডের নির্দেশনা হলো, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় বিষয়গুলো নিয়েই যেন ব্যস্ত থাকি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডাকসু ভিপি পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। দেশের মধ্যে অনেক অভাবনীয় ঘটনা ঘটছে। এ কারণে ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা বারবার কারা ঘটাচ্ছে, তা আমরাও জানতে চাই।
এদিকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টায় নিজেদের কোনও কর্মী জড়িত নন বলে দাবি করেছেন ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এসব বিস্ফোরণ ষড়যন্ত্রের অংশ। বিএনপি বা বিএনপির অঙ্গ সংগঠন যেখানে কর্মসূচি পালন করছে, সেখানে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো ও এসব ঘটনার দায়ে তাদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একাধিক নেতার দাবি, বিস্ফোরণগুলো সরকারের পক্ষ থেকে করানো হচ্ছে। বিএনপি ও ছাত্রদলের কার্যক্রমকে কোণঠাসা করার জন্যই এসব ঘটনার জন্ম হচ্ছে।
গত ২১ ডিসেম্বর প্রথম ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। রাজধানীর পল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিকালে ২টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। একইদিন রাতে আরও একটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। এরপর চার দিনের বিরতিতে ২৬ ডিসেম্বর বেলা ১১টার দিকে মধুর ক্যান্টিন এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটে। পরদিন ২৭ ডিসেম্বর আবার পল্টনে ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। একদিন বিরতি দিয়ে ২৯ ডিসেম্বর দুই দফায় মধুর ক্যান্টিন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরিত হয়। একইদিন দুপুরে পল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ৩০ ডিসেম্বর তৃতীয় দিনের মতো মধুর ক্যান্টিন এলাকায় এবং সর্বশেষ ১ জানুয়ারি দুপুরে দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন এলাকায়। এসময় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ছাত্রদলের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা চলছিল।
বুধবার (১ জানুয়ারি) এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ করছি ছাত্রদলের কমিটি হওয়ার পর থেকে এই ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা বেড়েছে। কমিটি থেকে পদবঞ্চিতরা এসব করতে পারে বলে আমাদের ধারণা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানান শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান। তিনি বলেন, হঠাৎ করে ককটেলগুলো নিক্ষেপ করা হচ্ছে। প্রথমে কোথায় থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল, তা টের পাওয়া মুশকিল ছিল। এখন আমাদের পুলিশ সদস্যরা সেসব স্থানে নজরদারি করছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সজাগ আছি। আর অতীতের ঘটনাগুলোরও তদন্ত চলছে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা জানতে আমাদের গোয়েন্দা সদস্যরা কাজ করছেন। হাতেনাতে ধরার আগে বা জড়িতদের গ্রেফতার না করা পর্যন্ত কারা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে তা নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না। তবে দ্রুতই জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার কথা বলেন তিনি।