রেহানা আক্তার বলেন, ‘গ্রামের মানুষ, ঢাকা শহরে কোথায় গিয়ে উঠবো, নিরাপত্তা কেমন হবে এসব কিছুই আর চিন্তা করতে হয় না— সব কিছু মিলিয়ে এখানে নিশ্চিত থাকা যায়।’
আশিক ফাউন্ডেশনে বসেই কথা হয় আব্দুল মোমেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে সুবিধা হইছে, অনেক সুবিধা হইছে। ডাল-ভাত যা-ই খাই, কিন্তু খুবই পরিচ্ছন্ন। ইনফেকশনের কোনও ভয় নাই।’ একই কথা বলেন, সুমনের দাদি, রেহনুমার মা, সৌরভের বাবাসহ প্রতিটি শিশুর পরিবার।
আশিক ফাউন্ডেশনে ঢুকেই দেখা যায়, ড্রয়িংরুমের মতো মাঝের জায়গাতে শিশুরা ছবি আঁকছে মেঝেতে বিছানো পাটিতে বসে। পাশেই ড্রয়িং বুক, হাতে কালার পেন্সিল। এই শিশুরা সবাই ক্যানসার রোগী, তাদের বাবা-মায়েরা সন্তানকে নিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। এখানে আসার পর উঠেছেন এই শেল্টার হোমে। বাংলা মোটরে অবস্থিত ২০ বেডের এই শেল্টার হোমে শিশুদের জন্য রয়েছে নানা ধরনের খেলনা, বই-খাতা, আঁকার সরঞ্জাম। এখানে থেকেই ক্যানসার আক্রান্ত সন্তানকে চিকিৎসা করান বাবা-মায়েরা। তারা বলছেন, এই শেল্টার হোম না থাকলে ঢাকায় থেকে সন্তানকে চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো না।
আশিক ফাউন্ডেশন তৈরি করেছেন সালমা চৌধুরী। তবে সেটা এমনি এমনি হয়নি। ক্যানসারে নিজের সন্তানকে হারিয়েছেন। অন্যের সন্তান যেন ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারেন, তাদের চিকিৎসায় যেন কোনও অবহেলা না হয়, সেজন্যই গড়ে তুলেছেন এই ফাউন্ডেশন।
আশিক ফাউন্ডেশনে শূন্য থেকে ১৮ বছরের ক্যানসার আক্রান্ত শিশু, যাদের চিকিৎসা চলছে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে, তাদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে যাতায়াত করে দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসা যাদের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়— মূলত তাদের জন্যই এই শেল্টার হোম। এই শেল্টার হোমে সার্ভিস চার্জ হিসেবে প্রতিদিন নেওয়া হয় ১০০ টাকা, এর ভেতরেই রয়েছে দুপুর আর রাতের খাবার, বিকালে নাশতা। কেউ চাইলে হোমে থেকে রান্না করেও খেতে পারেন।
কেন এই শেল্টার হোম জানতে চাইলে সালমা চৌধুরী বলেন, ‘আশিক ছিল আমাদের ছোট সন্তান। ১৯৯০ সালে সালে যখন ওর জন্ম হয়। তখন নানা জটিলতার কথা চিন্তা করেই ছেলেটার জন্ম হয় লন্ডনে, এরপর ঢাকায় এলাম। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই ওর জ্বর হতে থাকে। ঢাকার শিশু হাসপাতালে ভর্তি করালাম, থাকলাম কিছুদিন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম, এরপর আবারও জ্বর আর কিছু কিছু শারীরিক সমস্যা।’
আবার ছেলেকে নিয়ে লন্ডন যান সালমা চৌধুরী। চিকিৎসক সব ঠিক আছে জানালে চলে আসেন দেশে। কিন্ত নিয়মিত বিরতিতে জ্বর আসে যায়। ফের ছেলেকে নিয়ে তিনি একাই লন্ডনে গেলেন। টেস্ট দিলেন চিকিৎসকরা। বললেন, সেখানকার হাসপাতালে ভর্তি হতে, এরপর টেস্ট। চিকিৎসকরা ভেবেছিলেন হয়তো যক্ষ্মা হয়েছে, আমাদের আইসোলেশনে রাখা হলো। টেস্ট হলো-এবার ধরা পরলো ক্যানসার, তখন ওর বয়স দুই বছর তিন মাস।
চিকিৎসকরা জানান, “ক্যান্সার ছড়িয়ে পরেছে। দুই মে’তে চিকিৎসা শুরু, পাঁচ মে’তে চিকিৎসক বললেন, আর কোনও ট্রিটমেন্ট নেই। এরইমধ্যে ফুসফুস, কিডনিতে অস্ত্রোপচার হলো-ওইটুকুন ছেলে…। ২০ মে’তে ছেলেটা আমাদের ছেড়ে চলে গেলো।’
এরপরই ১৯৯৪ সালে আশিক ফাউন্ডেশন শুরু করলাম মন্তব্য করে সালমা চৌধুরী বলেন, ‘আমার মতো কোনও মায়ের যেন বুক শূন্য না হয়ে যায়। ভেবেছিলাম, ক্যানসারে যারা আক্রান্ত তারা যেন অন্তত চিকিৎসাটা পায়।’
আশিক ফাউন্ডেশন কাজ শুরু করেছিল গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীতে। প্রথমে মাসে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশুকে চেকআপ করা হতো, ঢাকা থেকে চিকিৎসক নিয়ে যেতেন তারা।
এরপর হাসপাতালগুলোতে যাওয়া শুরু করলেন সালমা চৌধুরী। বলেন, ‘দেখতাম বাচ্চারা হাসপাতালে আছে, কিন্তু তাদের জন্য কোনও প্লে সেন্টার নেই। লন্ডনে দেখেছি শেল্টার হোম রয়েছে— যারা লন্ডনের বাইরে থেকে আসতো, তারা হোমে থেকে চিকিৎসা করে আবার চলে যেতো, আবার প্রয়োজন হলে আসতো। একটি সরকারি হাসপাতালে প্লে সেন্টার করতে চাইলে তারা অনুমতি দিলো না। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। সেখানে দেখলাম, শিশুরা আসে ঠিকই-কয়েকদিন থেকে চিকিৎসাও করায় পরিবার, কিন্তু পরে আর ফলোআপে আসে না। কথা বলে জানলাম, থাকা-খাওয়াসহ অন্যান্য অসুবিধার কারণে পরিবারগুলো আসতে পারে না।’
তিনি বলেন,‘তখনই শেল্টার হোমের ভাবনা মাথায় আসে। যাতে করে বাবা-মায়েরা এ অসুবিধায় না পড়েন। শিশুগুলো অন্তত ফলোআপে আসতে পারবে-তারা সারভাইব করবে।’
২০০০ সাল থেকে আশিক ফাউন্ডেশন শেল্টার হোমে ৮১১টি ক্যানসার রোগী এসেছে। তারা যে সবসময় থাকে-তা নয়। চিকিৎসা করাতে আসে, ফলোআপে আসে। আশিক ফাউন্ডেশন শিশুদের ক্যানসারের ধরন বুঝে আর্থিক সহযোগিতাও করে যাচ্ছেন। চার রকমের ক্যানসারের ধরন অনুযায়ী আড়াই হাজার, তিন হাজার এবং পাঁচ হাজার করে টাকা দিচ্ছেন প্রতি মাসে।
কেবল শেল্টার হোমই নয়, ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য সালমা চৌধুরী ধানমণ্ডিতে গড়ে তুলেছেন ৯ শয্যার একটি প্যালিয়েটিভ কেয়ার সেন্টার—যা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রথম বলেও দাবি করেন তিনি। এখান থেকে যখন শিশুরা বাড়ি ফেরে, তখন তাদের অ্যাম্বুলেন্সে করে ফেরত পাঠানোর কাজটাও এই সংগঠন করে থাকে।
‘তবে চেষ্টা করে যাচ্ছি এসব শিশুদের পাশে থাকতে, পরিবারগুলোর পাশে থাকতে, দুই ছেলে-মেয়ে দেশের বাইরে থাকে, তাদের সহযোগিতা নিয়ে চলছি’, বলেন সালমা চৌধুরী।