দক্ষিণে জয় প্রত্যাশী পৌর মেয়ররা ‘গরিব’

বরিশালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার আশায় নির্বাচনে দাঁড়ানো মেয়র প্রার্থীরা বড়ই ‘গরিব’। এবারের নির্বাচনি হলফনামায় বর্তমান পৌর মেয়ররা এমন অনেক তথ্য দিয়েছেন যা রীতিমত হাস্যরসের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্পদের বিবরণের দিক থেকে তাদের কেউ কেউ একজন সাধারণ দিন মজুরের চেয়েও গরিব। কারও কারও সারা বছরের আয় নাকি মাত্র এক লাখ টাকা। স্থাবর অস্থাবর সম্পদও একজন খেটে খাওয়া মানুষের চেয়েও অনেক কম।

প্রথম যাত্রায় দক্ষিণের ১৭ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩০ ডিসেম্বর। এর মধ্যে ১৩টি পৌরসভার বর্তমান মেয়ররা দ্বিতীয় বারের মত মনোনয়ন পেয়েছেন। তার মধ্যে বিএনপি দলীয় মেয়র তিনজন। বাকি ১০জন ক্ষমতাসীন দলের।

বরিশাল জেলার ছয়টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩০ ডিসেম্বর। ছয় মেয়রই সরকারি দলের এবং পুনর্নির্বাচন প্রার্থী। এরমধ্যে একমাত্র বানারীপাড়ার পৌরমেয়র দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে মাঠে আছেন স্বতন্ত্র হিসেবে।

ক্ষমতার পাঁচ বছরে বর্তমান মেয়ররা কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়লেও তাদের নির্বাচনি হলফনামা দেখে রীতিমত বিস্ময় তৈরি হয়েছে। তাদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যারা নাকি চলছেন ধারদেনা করে। পুরো নির্বাচনের খরচ চালাবেন আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে আনা ধারের টাকায়।

বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ সরকারি দলের এবং পুনর্নির্বাচন প্রার্থী পৌর মেয়র কামালউদ্দীন দ্বিতীয়বারের মত আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। ইটভাটাসহ নানা ধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার। তবে হলফনামায় তিনি যে তথ্য দিয়েছেন তাতে দেখা যাচ্ছে কামালউদ্দীনই সবচেয়ে গরিব। নির্বাচনি ব্যয় নির্বাহের জন্য অর্থ প্রাপ্তির উৎস হিসেবে তিনি নিজের দেখিয়েছেন মাত্র ৫০ হাজার টাকা। বাকি নির্বাচনি ব্যয় চালাবেন আত্মীয় স্বজনদের দানের টাকায়। এর মধ্যে এক লাখ টাকা নেবেন আপন বড় ভাই নিজামউদ্দীনের কাছ থেকে। আর ভাইয়ের ছেলে আশ্রাফউদ্দীনের কাছ থেকে নেবেন ৫০ হাজার টাকা।

বাকেরগঞ্জে সরকারি দলের পৌর মেয়র প্রার্থী লোকমান হোসেন ডাকুয়াও কম ‘গরিব’ নন। তিনি এবারের হলফনামায় অস্থাবর সম্পদ হিসেবে দেখিয়েছেন ২০ তোলা স্বর্ন। তাও নাকি বিয়ের সময় উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। এছাড়া ব্যাংকে মাত্র এক লাখ টাকা আর নগদ তার হাতে রয়েছে ৫০ হাজার টাকা। স্থাবর সম্পদ হিসেবে রয়েছে ২৫ শতাংশ অকৃষি জমি। পেশায় তিনি একজন মাছ ব্যবসায়ী। সেখান থেকে বছরে আয় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বানারীপাড়ার সরকারি দলের বিদ্রোহী এবং আবারও জয় প্রত্যাশী পৌর মেয়র প্রার্থী গোলাম সালেহ মঞ্জু মোল্লা  এবার স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে আছেন। তিনিও ‘গরিবদের’ একজন! তিনি পেশায় রাখি মালের ব্যবসায়ী। নিজের বাড়িতে ধান, চাল ও সুপারীর রাখি মালের ব্যবসা করেন। কৃষিখাত থেকে তার আয় বছরে ৭২ হাজার টাকা। আর বাড়ি ভাড়া হিসেবে পান ৬২ হাজার টাকা। বছরে ব্যবসা  করে আয় দুই লাখ টাকা যা ২০১১ সালে ছিল এক লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে আছে নগদ দুই লাখ টাকা, পাঁচ ভরি স্বর্ন এবং ৩৫ শতাংশ অকৃষি জমি।

মুলাদী পৌরসভার মেয়র শফিকুজ্জামান এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। তিনি এবারের হলফনামায় অস্থাবর সম্পদ হিসেবে ২০ তোলা স্বর্নের হিসাব দেখিয়েছেন। ২০১১ সালের হলফনামায় তিনি অস্থাবর সম্পদ হিসেবে নগদ টাকা দেখিয়ে ছিলেন মাত্র ২৫ হাজার (নিজ নামে) ও স্ত্রীর নামে ৫ হাজার। সেবার তিনি নাকি ১০ লাখ টাকা ঋণও নিয়েছিলেন সোনালী ও সিটি ব্যাংক থেকে। ২০১১ সালে তার স্বর্নের পরিমাণ ছিল ১০ ভরি।

গৌরনদীর পৌর মেয়র হারিছুর রহমানের ঢাকায় কোটি কোটি টাকার ব্যবসা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনি হলফনামায় তিনি অনেকটা গরিবের কাতারেই নাম লেখিয়েছেন। এবার আয়ের উৎস্য হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন নির্বাচিত মেয়র হিসেবে প্রাপ্ত দুই লাখ ৪০ হাজার টাকার ভাতা। তার কৃষি আয় বছরে ৯০ হাজার টাকা। বছরে তার মোট আয় তিন লাখ ৩০ হাজার ২৩৯ টাকা। তবে স্বর্নের দিক থেকে তিনি একটু এগিয়েছেন। তিনি হলফনামায় ব্যবসা বর্হিভূত সম্পদ হিসেবে ৫০ ভরি অলংকার দেখিয়েছেন।

প্রার্থীদের এ ধরনের উদ্ভট ও হাস্যকর তথ্যের জন্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি বরিশালের সভাপতি প্রফেসর এম মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন প্রার্থীরা যখন বুঝতে পারেন তারা মিথ্যা তথ্য দিলেও কমিশনের কিছু করার নেই তখন এ ধরনের মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়। এটা এক ধরনের মানবিক দুর্নীতি। নির্বাচন কমিশন সবকিছু জেনেও প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মীর শাহজাহান বলেন যাছাই বাছাইয়ের কাজটি করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। তবে হলফনামার গরিবির তথ্যটা আসলেই ভাবনার বিষয়। এ ব্যাপারে রিটার্নিং কর্মকর্তাই ভালো বলতে পারবেন।

বরিশাল জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক ড. গাজী মোঃ সাইফুজ্জামান বলেন, প্রার্থীরা হলফনামা নিয়ে জনগনের কাছে যাবেন। জনগনই সবকিছু বুঝে শুনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন।

/এফএস/