‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা উচিত পাকিস্তানের’


মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তান সরকার নানা রকম বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়েছিল কয়েকদিন আগেও। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা সঠিক কাজ করেছিল,এমনটি বলতেও দ্বিধা করেনি দেশটির বর্তমান সরকার। এ নিয়ে বাংলাদেশে বয়েছিল সমালোচনার ঝড়। সমালোচনা হয় খোদ পাকিস্তানেও। কিন্তু এবার সে আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে দেশটিরই প্রভাবশালী দৈনিক ডন। বুধবার বাংলাদেশের ৪৪তম বিজয় দিবসের দিনে (১৬ ডিসেম্বর) পত্রিকাটির মন্তব্য প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় আলি ওসমান কাসমির একটি রচনায়। ওই রচনায় একাত্তরের গণহত্যা-নির্যাতনের জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের বিচারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা উচিত বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।আলি ওসমান কাসমি লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট-এর স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের ইতিহাস বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক। এ বছর তিনি করাচি সাহিত্য উৎসবে শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন।

আলি ওসমান কাসমি ‘1971 War: Witness to History’ শিরোনামের প্রতিবেদনে জাতি হিসেবে বাঙালির গড়ে ওঠা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিত, যুদ্ধের আগের রাজনৈতিক ঘটনাসহ যুদ্ধের সময়কার বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের বিভিন্ন তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে তার প্রতিবেদনে।
মন্তব্য প্রতিবেদনের শুরুতেই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের কথা তুলে ধরে নিজেকে তিনি দোষী ও লজ্জিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আলি ওসমান লিখেছেন, ‘যখনই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটি তখন একজন পাকিস্তানি হিসেবে অনুশোচনা ও লজ্জাবোধ করি।’২৫ মার্চের কালরাতের পর ঢাকার রাস্তায় পড়ে আছে গুলিবিদ্ধ নিরীহ রিকশাচালক ও যাত্রীর রক্তাক্ত মৃতদেহ...

এরপর তিনি ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিভাবে যৌক্তিক হয়ে ওঠে তার বিস্তারিত তুলে ধরেন। পাকিস্তানিরা যেভাবে বাংলাদেশে চালানো গণহত্যাকে যৌক্তিক হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন লেখায়।
মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, সারা বিশ্ব যখন জানে তখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণেরও জানা দরকার কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্ম হয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,পাকিস্তানিদের জানা উচিত ১৯৭১ সালের সংঘর্ষ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি।
এরপর আলি ওসমান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের কৃতকর্ম ও অপরাধ স্বীকার করে নেওয়ার এখনই সময় বলে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানি প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পূর্ব পাকিস্তানে যে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত করেছে তা পাকিস্তানিদের স্বীকার করে নেওয়ার সময় এখন।বেসামরিক এক বাঙালি তরুণকে নির্যাতন করে কথা আদায়ের চেষ্টা করছে পাকিস্তানি সেনারা...

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে পাকিস্তানের সমর্থকরা এখনও বিতর্ক উস্কে দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর সূত্র ধরে,একাত্তরে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের একটা মীমাংসায় আসা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথাও তুলে ধরেন আলি ওসমান।
তার মতে, একাত্তরে যুদ্ধাপরাধের মতো অমীমাংসিত বিষয় নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা দরকার পাকিস্তানের। স্বাধীনতাযুদ্ধে যা ঘটেছে তার ইতি টানা দরকার বাংলাদেশের। বিষয়টির একটি মীমাংসায় আসার পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধের দায়ে পাকিস্তানপন্থী আল বদর ও আল শামসের বিচার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ রাজনীতি করছেন। ফলে এ বিচার নিয়ে বাংলাদেশের সমাজে দ্বিমত ও বিভেদ তৈরি হচ্ছে। কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে আমাদের (পাকিস্তান) সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান সরকারের মনোভাব  তুলে ধরে তিনি লিখেছেন,পাকিস্তান অতীতে আনুষ্ঠানিকভাবে শিথীল দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এটাতে কিছুই বোঝায় না। এরপর থেকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নীতি হচ্ছে এরকম- অতীতের বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে গেছে,সবাইকে সামনের দিকে থাকতে বলা। কিন্তু ব্যাপক আকারের হত্যাযজ্ঞ ও কোটি কোটি বাংলাদেশি যে নির্যাতন ভোগ করেছে তার সমাধান অতীত ভুলে যাওয়া এবং সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নয়। এটা ভুলে যাওয়ার মতো বিষয় না। তবে এর আবেগিক ও মানসিক ক্ষত কমানো যায় যদি সাধারণ পাকিস্তানিরা এগিয়ে আসেন।
বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে মিত্রবাহিনীর সেনাদের সঙ্গে বাঙালির উল্লাসমুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা কথা সাধারণ পাকিস্তানিদের অনুধাবন করার আহ্বান জানান তিনি লেখায়। তিনি লিখেছেন, এটা করতে হলে আমাদের ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে কী ঘটেছিল তার বিস্তারিত জানা দরকার। তাদের (বাংলাদেশি) নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণা ও বেদনা বুঝতে খুব বেশি কিছু করার দরকার নাই।

শেষের দিকে তিনি লিখেছেন,সোজা কথায় ১৯৭১ সালে যারা নিহত হয়েছেন বা যন্ত্রণাভোগ করেছেন তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে পাকিস্তানে একটি স্মৃতিসৌধ করার পক্ষে আমরা (পাকিস্তানি) আবেদন জানাই। জার্মানি এটা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ভিয়েতনামে নিহতদের স্মরণে করছে। তাহলে আমরা কেনও পারব না?

ছবি: মুজিবনগর সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট 

/এএ/এসএম/