রাজধানী বিয়াম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে পুলিশের বিশেষ শাখার মহাপরিচালক জবেদ আলী বলেন, পৌর নির্বাচনে উত্তরবঙ্গই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। সম্প্রতি ওই এলাকায় জঙ্গি হামলা বেড়ে গেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তাদের তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। নির্বাচনি সভা-সমাবেশ হলে সেখানে অতিরিক্ত সতর্কতা নিতে হবে।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি জঙ্গিদের হাতে রংপুরে জাপানের নাগরিক ওসি কুনিও নিহত হন। দিনাজপুরে ইতালির যাজক পিয়েরে পারোলারি ও পাবনায় পাদ্রি লুক সরকারের ওপর জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়া, দিনাজপুরে ইস্কন ও কান্তজিউ মন্দিরে এবং বগুড়ায় শিয়া মসজিদে জঙ্গিরা হামলা চালায়।
জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ টেনে র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, সহিংসতাকারীরা লোক-সমাগম বেশি এমন জায়গায় জঙ্গিরা আক্রমণের টার্গেট করে। এক্ষেত্রে র্যাব সব সময় সজাগ থাকবে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রাখা হবে। কোনও ঘটনা ঘটলেই যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেজন্য তৎপরতা জোরদার করা হবে।
অবশ্য, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। জঙ্গিদের নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনও পরিস্থিতি নেই। পুলিশের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের বক্তব্য শেষে সিইসি জঙ্গিরা হামলার বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেন।
এদিকে, জঙ্গিরা হামলা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের জানিয়েছেন। নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক বলেও তারা আশ্বস্ত করেছেন।
নির্বাচনের আগের রাতে যেন ‘ভোট কার্টিং না হয়ে যায়’
মতবিনিময় সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও রিটার্নিং অফিসারদের সতর্ক করে দিয়ে সিইসি বলেন, অতীতে ভোটের আগের রাতে কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপারে সিল মারার অভিযোগ শুনেছি। এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এত ফোর্স থাকার পরও ভোটের আগের রাতে কেন্দ্র দখল হচ্ছে কেন? ভোটের আগের রাতে যদি কেন্দ্র দখল হয়ে যায়, তাহলে এত ফোর্স দিয়ে লাভটা কী? আপনারা আইনের অধীনে থেকে প্রতিটি পদক্ষেপ নেবেন। কেউ যেন বলতে না পারেন, আইন মোতাবেক কোনও কাজ হয়নি। ব্যবস্থা নিয়ে কমিশনকে জানাতে হবে। ব্যবস্থা না নিয়ে জানালে চলবে না। তিনি বলেন, মোবাইল টিম যদি দুই-চার জনের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে অন্যরা সেটা থেকে ভয় পেয়ে যাবেন। অনিয়মের প্রবণতা কমে আসবে।
নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হলে আমরা বিব্রত হই
সিইসি তার বক্তব্যে ভোটের আগে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার ও বেআইনি অস্ত্র উদ্ধারের নির্দেশনা দেন। এ সময় তিনি সন্ত্রাসী গ্রেফতারের সময় সাধারণ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে বিশেষ নজর রাখতে বলেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে কোনও নিরীহ মানুষ যেন অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হলে আমরা বিব্রত হই।
অনিয়ম হলে ভোট বন্ধ
সিইসি কাজী রকিব তার বক্তব্যে কেন্দ্র দখল ও ভোট কেন্দ্রে অনিয়ম হলে সঙ্গে-সঙ্গে ভোটগ্রহণ বন্ধ করে দিতে রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, মনোবল নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকলে অল্প-সংখ্যক ফোর্স দিয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। ফোর্স বেশি দেওয়ার পরেও অতীতে কেন্দ্র দখল হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনে কোনওভাবেই যেন এটা না হয় তা দেখতে হবে।
রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, আপনার সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটকেন্দ্রে যেন কোনওভাবে প্রভাবিত না হয়। দুর্বৃত্তরা যেন কেন্দ্রে দখল না করে। প্রয়োজন হলে কেন্দ্রে বন্ধ করে দিতে হবে। ভোটকেন্দ্র কারা প্রবেশ করছেন এবং কারা বের হচ্ছেন সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে করা ঢুকলেন, কারা বের হলেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন দুবৃত্তকারীরা ভোটকেন্দ্র না ঢুকতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যেন এলার্ট থাকেন।
আচরণবিধি লঙ্ঘনে অ্যাকশন নিন
আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রসঙ্গে বৈঠকে সিইসি বলেন, আমি ঢাকায় বসে সব ঠিক করতে পারব না। মাঠে আপনারা থাকেন। আইনভঙ্গ হলে অ্যাকশন নিতে হবে। তারপর আপনারা আমাকে জানবেন, কী অ্যাকশন নিয়েছেন। আপনরা অ্যাকশন না নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে, অ্যাকশন নেওয়ার কথা বলেন, এটা তো হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা অ্যাকশন নিয়েছি। নিয়েও দেখিয়েছি। এভাবে আপনারা অ্যাকশন নিন, দেখিয়ে দিন।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে দায়িত্ব নিয়েছেন বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সেটি সঠিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে। আমাদের যেন বলা না লাগে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ভূমিকায় সন্দিহান শাহ নেওয়াজ
বৈঠকে রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে, কিন্তু দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। সংবাদপত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে, বলে সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে, আবার আপনারা বলছেন, কিছু হচ্ছে না। তাহলে মাঝামাঝি পর্যায়ে কিছু একটা হচ্ছে সেগুলো তদন্ত করা হবে।
বৈঠকে নির্বাচন কমিশনার আবু হাফিজ যুক্তরাষ্টের ভ্রমণের নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক বৈঠকে তুলে ধরেন। জাবেদ আলী বিভিন্ন দিক নির্দেশনামূলক কথা বলেন। তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক কোনও বক্তব্য দেননি।
সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা আইজিপির, বেশি পুলিশে আপত্তি
পুলিশের আইজি একেএম শহীদুল হক ভোট কেন্দ্রে টেলিভিশনগুলোর সরাসরি সম্প্রচারের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, অনেক সময় ভোটে কেন্দ্রে ছোটখাটো ঘটনা ঘটে থাকে এবং আমরা খবর পাওয়ার পর তা স্বল্প সময়ের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হই। কিন্তু টিভিগুলো লাইভ সম্প্রচারের মাধ্যমে এই ঘটনা ফলাও করে প্রচার করে। এতে দেশ-বিদেশে এটা ছড়িয়ে পড়ে। অথচ, তারা যেভাবে প্রচার করে, তাতে দেখা যায়, ঘটনা সেই তুলনায় খুবই নগন্য। জবাবে সিইসি বলেন, গণমাধ্যমের কার্যক্রমের বিরোধিতা করা ঠিক হবে না। গণমাধ্যম হচ্ছে, একটা ফোর্স। আমরা কেন তাদের কাজে লাগাব না। গণমাধ্যম লাইভ করে বলেই কোথাও অনিয়মের ঘটনা ঘটলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা জানতে পারি। তাদের খবর দেখে আমরা যেকোনও ঘটনার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারি।
বৈঠকে আইজি আরও বলেন, ২৩৪টি পৌরসভায় ২১ হাজারের মতো পুলিশ সদস্য লাগবে। প্রতিটি কেন্দ্রে ৫ থেকে ৬ জন রাখতে গেলে একটু সমস্যা হবে। তাই সাধারণ কেন্দ্রে তিনজন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে চারজন পুলিশ সদস্য রাখার পক্ষে মত দেন আইজিপি। তবে, আইজিপির এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রয়োজনে টহল সদস্য কমিয়ে দিয়ে কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ সদস্য রাখবেন।
আন্তঃদলীয় কোন্দলের আশঙ্কা
মতবিনিময় সভায় একটি গোয়েন্দাসংস্থার প্রতিনিধিরা বলেন, পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তঃদলীয় কোন্দল বেড়ে যেতে পারে। ভোট কেনাবেচার নামে কালো টাকার ছড়াছড়ি হতে পারে। নির্বাচনের সুযোগে অনেক দাগি আসামিরা জেল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে।
ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি
বৈঠক সূত্র জানায়, একজন জেলা প্রশাসক প্রতিটি কেন্দ্রে সিসিটভি ক্যামেরা স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। এতে করে সন্ত্রাসী ভোট কেন্দ্রে দখলের চেষ্টা করলে পরবর্তী সময়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তিনি বলেন, যেহেতু আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ দাবি করি। কজেই আমাদের উচিত হবে সব কেন্দ্রে সিসিটিভি স্থাপন করা। তাহলে প্রকৃত দোষীদের বিচার করা যাবে।
/এমএনএইচ/