ভ্যাকসিন কীভাবে পাবে বাংলাদেশ?

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন (প্রতীকী)চীনের সিনোভ্যাক কোম্পানির তৈরি করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়ালের অনুমোদন দিয়েছে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তবে চীনা ভ্যাকসিনের এই ট্রায়াল কবে নাগাদ হতে পারে, সে বিষয়ে এখনও কিছুই জানানো হয়নি। এদিকে আলোচনার পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে— এখনও যে ভ্যাকসিন একেবারেই অজানা, বাংলাদেশ সেটি কখন পাবে, কীভাবে পাবে? সিনোভ্যাককে অনুমোদন দেওয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়াতে দেশে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সুযোগ বাড়লো। একইসঙ্গে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ‘একক সোর্স না হয়ে মাল্টিপল সোর্স’ থাকলে দেশের জন্য ভালো।

বিশেষজ্ঞরা জানান, চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে তৃতীয় ধাপে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অনেক মানুষের শরীরে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে তার ফলাফল দেখা হয়, পরীক্ষায় সবকিছু সফল হলেই সেই ভ্যাকসিন কার্যকর করার অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাক রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডকে গত ১৮ জুলাই বাংলাদেশে তাদের টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল (বিএমআরসি)।

বিএমআরসির পরিচালক ডা. মাহমুদ উজ জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে তখন জানান, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বার্ন ইউনিট-১, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইউনিট-২ এবং ঢাকা মহানগর হাসপাতালে এই টিকার পরীক্ষা করা হবে। আগামী ১৮ মাস ধরে দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরে এই টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের কাজ করবে আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআর,বি।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত বিশ্বে ১৪১টি ভ্যাকসিন ডেভেলপ হয়েছে। হিউম্যান ট্রায়াল বা শেষ ও তৃতীয় ধাপে রয়েছে ২৫টি ভ্যাকসিন। এরমধ্যে থার্ড ফেইজের ট্রায়ালে রয়েছে চীনের তিনটি, অক্সফোর্ডের একটি, মডার্নার একটি ও ফাইজারের একটি। আর সবকিছু নির্ভর করছে থার্ড ফেইজে ট্রায়ালের রেজাল্টের ওপর। তবে সারা পৃথিবীর চেষ্টা— সবাই প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। সেই প্রস্তুতির মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে।

ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (জিএভিআই বা গ্যাভি-টিকা বিষয়ক আন্তর্জাতিক জোট) কাজ করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, যখনই ভ্যাকসিন আসুক না কেন, সারা পৃথিবীর মানুষ যেন একসঙ্গে পায় সে বিষয়ে গত ৪ জুন গ্লোবাল ভ্যাকসিন সামিট হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে ‘কো-ভ্যাক্স’ ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে পৃথিবীর সবাই যেন সমহারে ভ্যাকসিন পায়। ওই সামিটে আরও সিদ্ধান্ত হয়— কো-ভ্যাক্স ফ্যাসিলিটিতে ভ্যাকসিন প্রথমে যাবে ফ্রন্ট লাইনার হিসেবে কাজ করা চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী প্রমুখের কাছে।

পুরো বিশ্বে এর ‘রাফলি’ সংখ্যা শতকরা তিন শতাংশ। পরবর্তীতে সেখানে যোগ হবে যারা অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সীরা। সে হিসেবে ২০ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিন পাবে। সেটা মাথায় রেখেই ২০২১ সালের মধ্যে যেন ভ্যাকসিন আসে তার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

তবে এই কো-ফাইন্যান্সিংয়ের মডালিটি কী হবে, সেটা সেপ্টেম্বরে গ্যাভির বোর্ড মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তিন শতাংশ ফ্রন্টলাইনার হিসেবে প্রথমবার প্রায় ৫১ লাখ ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। সবকিছু মিলিয়ে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ভ্যাকসিন পাবে পর্যায়ক্রমে।

অর্থনৈতিকভাবে যেসব দেশ উন্নত নয় সেসব দেশের জন্য কো-ভ্যাক্স বা গ্যাভির মতো সংস্থা থেকে ভ্যাকসিন কিনে নেয়, কম মূল্যে অথবা বিনামূল্যে দেয়। তবে সবাই কেনাকাটা করার পরে এমন দেশগুলো ভ্যাকসিন পাবে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন আমেরিকাতে ৩০ হাজার, ব্রাজিলে পাঁচ হাজার, দক্ষিণ আফ্রিকাতে দুই হাজার ভলান্টিয়ারের ওপরে ট্রায়াল হচ্ছে। যারা ভলান্টিয়ারের ওপর ট্রায়াল দিচ্ছেন—তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাবেন। তারা এমনিতে দিচ্ছেন না—এর ভিত্তিতে তারা ভ্যাকসিন পাবেন। তারা পাবার পর ‘কো ভ্যাক্স’ বা ‘গ্যাভি’র মতো সংস্থা থেকে অন্যান্য দেশ ভ্যাকসিন পাবে। গ্যাভি এবং কো ভ্যাক্স থেকে ভ্যাকসিন পেলেও সেটা আমরা পরে পাবো এবং পেতে অনেকটা দেরি হবে।

এদিকে, বাংলাদেশ এক্সপ্রেসন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) সাবমিট করেছে গত ৯ জুলাই। কো-ভ্যাক্স ফ্যাসিলিটি এবং গ্যাভি এটা ইতোমধ্যে জানিয়েছে বাংলাদেশ ভ্যাকসিন পাবে। কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়ার ক্ষেত্রে উন্নত দেশ কিনে নেবে, আর আমাদের মতো মধ্যম আয়ের দেশ কো-ফাইন্যান্সিং হিসেবে যাবে। পৃথিবীর ১৭১টি দেশ এই কো-ফাইন্যান্সিংয়ের ভেতরে রয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য তারা গত তিন মাস ধরে প্রস্তুতি শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এ সম্পর্কিত গ্রাউন্ড ওয়ার্কও শুরু করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

চীনের সিনোভ্যাক ভ্যাকসিনকে বাংলাদেশে ট্রায়ালের জন্য অনুমতি দেওয়াতে সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ট্রায়ালে যদি অবস্থা ভালো হয়, তাহলে আমরা ওই টিকা নেবো। যদি ভালো না হয় তাহলে আমরা নেবো না।’

‘‘তাই সিনোভ্যাকের ট্রায়াল দিতে আমরাও সুপারিশ করেছিলাম পরামর্শক কমিটি থেকে। একইসঙ্গে যদি সেটা ‘ভালো’ হয়, তাহলে আমাদের দেশের কোনও কোম্পানিকেও লাইসেন্স দিতে বলা যেতে পারে ‘প্রডিউস’ করার জন্য। কারণ, দেশে প্রডিউস হলে দাম কম হওয়ার সুবিধাটাও আমরা পাবো”-বলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

সিনোভ্যাকের ট্রায়ালের অনুমতি দেওয়াতে সরকারকে স্বাগত জানিয়ে মন্তব্য করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এটা ভালো হলো। আমরা অন্যান্য ভ্যাকসিনের ট্রায়ালও দিতে চাই, যেটাই কার্যকর হবে- সেটা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে তাহলে।’

ডা. মুশতাক হোসেন আরও বলেন, ‘ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ নীতিগতভাবে অনেক অপশন বা বিকল্প খোলা রেখেছে।’

তিনি বলেন, ‘চীনের তিনটি কোম্পানি তৃতীয় ধাপে রয়েছে, আরও দুটি কোম্পানি যারা দ্বিতীয় ধাপের ট্রায়াল শেষ করেছে। তারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে বাংলাদেশে ট্রায়াল করতে। তবে কেবল সিনোভ্যাক মাত্র অনুমতি পেলো। সবগুলোর জন্য বাংলাদেশ ওপেন আর গ্যাভিতে বাংলাদেশ সব কার্যক্রম শেষ করেছে।’

‘কো-ভ্যাক্সে বাংলাদেশ চিঠি দিয়েছে গত ৯ জুলাই। কাজেই সব জায়গাতেই বাংলাদেশ সুযোগ সৃষ্টি করে রেখেছে। তবে টিকাতো সব সফল হবে না, কোনও কোনোটা সফল হবে। তবে যত বেশি আমরা ইনভলব হবো ততবেশি সম্ভাবনা থাকবে সফল টিকা পাওয়ার বেলায়’, বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতি অনুযায়ী, সব দেশেই যারা সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের দুটো করে হলেও একসঙ্গে দিতে হবে ভ্যাকসিন। জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে একটা মনোভাব ব্যক্ত করেছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাসচিব। এখানে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না, কাজেই সব দেশে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে ভ্যাকসিন দিতে হবে এবং পরবর্তীতে ঝুঁকিপূর্ণ যারা তাদেরও একসঙ্গে দিতে হবে, বলেন ডা. মুশতাক হোসেন।

এদিকে, অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশও করোনার ভ্যাকসিন পাবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মা, শিশু ও কৈশোর স্বাস্থ্য কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. শামসুল হক।

ইপিআই মূলত শিশুদের টিকাদানের বিষয়ে কাজ করে বলেই করোনা ভ্যাকসিনের বিষয়ে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

অন্য কোনও দেশের ট্রায়াল বাংলাদেশে হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বিশ্বের আটটি কোম্পানি ভ্যাকসিন ট্রায়ালের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ট্রায়ালের আগ্রহ দেখালে বাংলাদেশ তা বিবেচনা করবে।’

এদিকে, ভ্যাকসিন কেনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগ্রহ কতটুকু এমন প্রশ্নের উত্তরে জাহিদ মালেক বলেন, ‘বাংলাদেশে মাথাপিছু আয়ের অনুপাতে কিছু ভ্যাকসিন ফ্রি পাবে। তবে সরকার কেবল ফ্রি ভ্যাকসিন পেতেই বসে থাকবে না। সরকার ভ্যাকসিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকবে না।’

উল্লেখ্য, পৃথিবীতে প্রায় ১৪০টি দেশ এবং কোম্পানি ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করছে। পাঁচ থেকে ছয়টি ভ্যাকসিন একেবারে তৃতীয় ধাপে রয়েছে। বাংলাদেশ ভ্যাকসিনের আবেদন করেছে গত জুলাই মাসে।

চীন, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্যাকসিনের কাজ অ্যাডভান্সড স্টেজে রয়েছে। বাংলাদেশেও কয়েকটি কোম্পানি ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে।