রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়াহিদা সিফাত আত্মহত্যা করেছে, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে— তা জট বাঁধতে থাকে ডাক্তারের দেওয়া ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনকে ঘিরে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) চিকিৎসক জোবাইদুর রহমানের করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ‘আত্মহত্যা’ বলা হলেও পরবর্তী আরেকটি প্রতিবেদনে সিফাতকে ‘হত্যা’ করার অভিযোগ উঠে আসে।
২০১৫ সালের ২৯ মার্চ সন্ধ্যায় রাজশাহী মহানগরের মহিষবাথান এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে সিফাতের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পরদিন সিফাতের চাচা মিজানুর রহমান খন্দকার রাজপাড়া থানায় হত্যা মামলা করেন।
কিন্তু রামেক চিকিৎসক জোবাইদুর রহমানের করা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সিফাত আত্মহত্যা করেছেন। পরে আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করেন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিন জন চিকিৎসক।
দ্বিতীয় দফার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অনুযায়ী তদন্ত শেষে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ সিফাতের স্বামী আসিফ প্রিসলি, আসিফের বাবা মোহাম্মদ রমজান, মা নাজমুন নাহার ও প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জোবাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়।
এরপর মামলাটির শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণা করে করেন আদালত। রায়ে সিফাত হত্যা মামলায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে তার স্বামী মোহাম্মদ আসিফ প্রিসলিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। তবে আসিফের বাবা মোহাম্মদ রমজান, মা নাজমুন নাহার নজলী ও প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসক জোবাইদুর রহমান খালাস পান।
এদিকে বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে খালাস চেয়ে আপিল করে আসিফ। অপরদিকে আসিফের সাজা বৃদ্ধি ও অন্য তিন আসামির খালাসের বিরুদ্ধে আবেদন করে বাদীপক্ষ, যার শুনানি শেষে রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিচারিক আদালতের রায় বাতিল ঘোষণা করে রায় দিলেন হাইকোর্ট।
বিচারিক আদালতের রায় বাতিলের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আসিফের আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে মেরে ফেলার অভিযোগে আসিফের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ পত্র দেওয়া হয়েছিল। অথচ রায় প্রদানকালে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় হত্যার প্ররোচনার অভিযোগে আসিফকে সাজা প্রদান করে আদালত। সিফাতের আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আসিফকে ১০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল দায়ের করা হয়। সে আপিল আবেদনের শুনানিকালে হাইকোর্ট দেখতে পান— আসামি আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছিল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায়, অথচ তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে দণ্ডবিধি আইনের ৩০৬ ধারায়। তাই নিম্ন আদালতের সাজাপ্রদান ত্রুটিপূর্ণ রয়ে গেছে প্রতিয়মান হওয়ায় মামলাটি পুনর্বিবেচনার (নিম্ন আদালতে) জন্য পাঠানো হয়েছে। হাইকোর্ট মামলাটি তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলেছেন। অন্যথায় তিন মাস পর আসামি আসিফ জামিন চাইলে তা বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। এছাড়াও খালাস পাওয়া আসিফের বাবা, মা ও প্রথম ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসককে নতুন করে নিম্ন আদালতে হাজির হয়ে বেইলবন্ড দাখিল করে জামিন নিতে আদেশ দিয়েছেন। এছাড়াও আদালত বাদীপক্ষের আবেদনটিও নিষ্পত্তি করেছেন। ’
এখন রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কিনা তা বিবেচনা করা হবে বলেও জানান আইনজীবী সারওয়ার আহমেদ।
আরও পড়ুন:
রাবি শিক্ষার্থী সিফাত হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায় বাতিল