যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকা (৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ডলার), যা দেশের বর্তমান মোট জাতীয় বাজেটের দেড়গুণ। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বছর-বছর বাড়ছে পাচারের এই হার। এর মধ্যে শুধু ২০১৩ সালে পাচারের পরিমাণ ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কারণ মূলত তিনটি। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলে অর্থ পাচারও বেড়েছে।
এছাড়া, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বাড়ছে।
বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালি, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক। শিল্পের কোনও যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে খালি কনটেইনার আমদানির ঘটনাও ধরা পড়েছে। এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রতিবছর অর্থ পাচার বাড়ছে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ইনভয়েসে পণ্যের দাম কম-বেশি দেখিয়ে পাচার হচ্ছে ৬০ ভাগ অর্থ। এছাড়া, মালেয়শিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পে বাংলাদেশি বিত্তশালীদের বিনিয়োগ বাড়ছে, এটা উদ্বেগের। এভাবে বিদেশে অর্থ পাচার, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির ঘটনা প্রতিরোধ করা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ২ মাসে (জুলাই ও আগস্ট) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তির হার বেড়েছে। গত দুই মাসে যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৫৬ কোটি ৯৭ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫১ কোটি ৮ লাখ ডলার। ঋণপত্র খোলার হার ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৬২ কোটি ২২ লাখ ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ওই সময়ে যা ছিল মাত্র ৪৭ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে নিষ্পত্তি বেড়েছে ৩০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এর আগে জুন মাসে মূলধনী যন্ত্রাংশের জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৪৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ২০ কোটি ৯৯ লাখ ডলার।
এদিকে, আমদানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কি না—বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি আমদানিকারকের সক্ষমতা যাচাই করে ঋণপত্র খোলার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইসঙ্গে এ ধরনের এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বোর্ডের অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনেক আমদানি পণ্যে কাস্টমস ডিউটি থাকে না। এর পরও সেসব পণ্যের আমদানি অতি মূল্যায়িত দেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার একটি অংশ বাইরে পাচার হতে পারে।
এদিকে, জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) তথ্যমতে, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৩০৬ কোটি ডলার। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) তথ্যমতে, প্রতিবছর পাচার হয় ১৪০ কোটি ডলার।
রফতানির নামে মুদ্রা পাচারের ঘটনাও বেড়েছে। সম্প্রতি ভুয়া এলসি (ঋণপত্র) ও ক্রয়চুক্তির মাধ্যমে টাকা পাচার হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনা ধরা পড়েছে। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখা, বংশাল শাখা, বেসিক ব্যাংকের শান্তিনগর শাখা থেকে এ ধরনের পাচারের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওইসব শাখার মাধ্যমে পণ্য রফতানি করা হলেও তার মূল্য দেশে আসেনি। অর্থাৎ ওইসব টাকা পাচার হয়ে গেছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকের মাধ্যমে ১৯৯ কোটি টাকা, কমার্স ব্যাংকের মাধ্যমে ১৫৭ কোটি টাকার রফতানি আয় দেশে না আসার তথ্য মিলেছে। রফতানি আয় দেশে না আসার ঘটনা অন্যান্য ব্যাংকের ক্ষেত্রেও রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। এ অবস্থায় দেশে কার্যত কোনও বিনিয়োগ হচ্ছে না। ব্যবসায়ীরাও ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। তবু মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বেড়ে যাওয়া কোনও ভালো লক্ষণ নয়। তিনি বলেন, অনেক সময় ওভার-ইনভয়েসিং হয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু করা থাকে না। তবে কাস্টম বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে যন্ত্রপাতির মূল্য পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে। অনেক সময় পুরনো যন্ত্রপাতি নতুন বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। আবার যে পরিমাণ যন্ত্রপাতিতে ঋণপত্র খোলা হয়, তার চেয়ে অনেক কম আনা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৪৩৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি। আর নিষ্পত্তি হয়েছে ৩১০ কোটি ডলার। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। বিগত ৫ বছরে আমদানি হয়েছে ১ হাজার ৯ কোটি ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি, যা তার আগের পাঁচ বছরে ছিল ৮৫৫ কোটি ডলার। এ পরিস্থিতি আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচারের আশঙ্কায় ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর দেওয়া চিঠির জবাব সন্তোষজনত না হওয়া সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবার তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে হয়েছে ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে (২০১৩-১৪) মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৫.৮৮ শতাংশ, নিষ্পত্তিতে ছিল ১৮.৯৫ শতাংশ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র খোলায় প্রবৃদ্ধি ছিল ৩০.৩৯ শতাংশ। কিন্তু ঋণপত্র নিষ্পত্তিতে ছিল ১৫.৮৫ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫.৮৫ শতাংশ ঋণপত্র কম নিষ্পত্তি হয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ২ মাসে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ২৬০ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে। এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি ৯২ লাখ ডলার। অর্থাৎ কাঁচামাল আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। পাশাপাশি এসব পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ২৪৭ কোটি ৮৪ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ২৪৫ কোটি ৯৮ লাখ ডলার।
অর্থবছরের ব্যবধানে নিষ্পত্তি বেড়েছে দশমিক ৭৫ শতাংশ। তথ্য অনুযায়ী, টেক্সটাইল মেশিনারি, চামড়া শিল্প, পাটশিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প, প্যাকিং শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মেডিকেল শিল্প, জ্বালানি বা বৈদ্যুতিক শিল্প, ইলেক্ট্রনিক শিল্পের যন্ত্রপাতি, স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, জাহাজ তৈরি শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি উভয়ই বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমদানির বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। তিনি বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনেক বেশি প্রবৃদ্ধি। এখানে বেশি মূল্য দেখানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ডের (বিওআই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ মাসে বিনিয়োগ নিবন্ধন ৫৬ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে দেশি ও বিদেশি মিলে ১৪ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। আগের তিন মাস অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনে এর পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। এ হিসেবে আলোচ্য সময়ে বিনিয়োগ ১৮ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা কমেছে। ফলে এ খাতে প্রস্তাবিত কর্মসংস্থান কমে আসছে। বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ব্যক্তি খাতে ৫ লাখ ৩ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হয়েছিল। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৪ লাখ ৫১ হাজারে। আর পরবর্তী অর্থবছরে (২০১২-১৩) কর্মসংস্থান কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৯ হাজারে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের সাত মাসে ব্যক্তি খাতে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার কর্মসংস্থান হয়।
/এমএনএইচ/