ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউস্থ ৬০ কাঠা প্লটের ওপর ১৬তলা বাণিজ্যিক-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণে ডেভেলপার কোম্পানি বোরাক রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তিতে ডেভেলপার কোম্পানিকে লাগামহীন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। নিজেদের অর্থায়নে নির্মিত ফ্লোরও ডেভেলপার কোম্পানিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ভবনটি ১৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণের কথা থাকলেও ডেভেলপার কোম্পানি ২৪ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করেছে। বিষয়টি নিয়ে খোদ সরকারের অডিট বিভাগ আপত্তি জানিয়েছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে শাস্তির সুপারিশও করেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।
ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ডিএনসিসি কামাল আতাতুর্ক এভিনিউস্থ ৪৪নং দাগের ৬০ কাঠা প্লটের ৪৪ কাঠা জমিতে ১৬ তলা বাণিজ্যিক-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। ১৬ তলা ফাউন্ডেশনসহ ৩ তলা মার্কেট ভবন ও একটি ভূগর্ভস্থ পার্কিং স্পেস (যার আয়তন ১,২৩,০০৪ বর্গফুট) নির্মাণ করার পর অবশিষ্ট ফ্লোর নির্মাণের জন্য ২০০৬ সালের ৭ মে ডেভেলপার কোম্পানি বোরাক রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী ডেভেলপার কোম্পানি তফসিলি জমিতে ১৩ তলা ভবন নির্মাণ করবে।
চুক্তি অনুযায়ী চুক্তিপত্র সম্পাদনের পর চূড়ান্ত নকশা অনুমোদনের দিন থেকে মার্কেট নির্মাণকাল হবে ৩০ মাস। ডেভেলপার কোম্পানি ২০০৯ সালের ১৮ মে চুক্তি সংশোধনের জন্য তৎকালীন ডিসিসির কাছে আবেদন করে। উক্ত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ডিসিসির বাজার সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাক্ষরিত এক স্মারকে একই বছরের ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে ডেভেলপার কোম্পানিকে সংশোধন প্রস্তাব পেশ করার জন্য অনুরোধ করা হয়। ২০১০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংশোধিত প্রস্তাব পেশ করে ডেভেলপার কোম্পানি। পরে ওই বছরের ৬ অক্টোবর উভয়পক্ষের মধ্যে সংশোধিত চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
মূল চুক্তিতে বেজমেন্ট পার্কিংয়ের ১০০ ভাগ ডিসিসির শেয়ার ছিল। সংশোধিত চুক্তিতে ডেভেলপার কোম্পানিকে বেজমেন্ট পার্কিংয়ের শেয়ার প্রদান করা হয়েছে। মূল চুক্তিতে লেভেল ১৩ পর্যন্ত শেয়ার বণ্টন করা হয়েছিল। সংশোধিত চুক্তিতে লেভেল ১৪ নির্মাণের কথা উল্লেখ করে তার শতভাগ শেয়ার ডেভেলপারকে দেওয়া হয়। মূল চুক্তিতে ডেভেলপারের প্রাপ্য জমির পরিমাণ ছিল ১৮ দশমিক ৯৯ কাঠা। সংশোধিত চুক্তিতে ডেভেলপারের প্রাপ্য জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৯ দশমিক ১৭ কাঠা। চূড়ান্ত নকশা অনুমোদনের দিন থেকে মার্কেট নির্মাণকাল ছিল ৩০ মাস। সংশোধিত চুক্তিতেও নির্মাণকাল দেখানো হয়েছে ৩০ মাস। কিন্তু এই ৩০ মাস গণনা কখন থেকে শুরু হবে তা স্পষ্ট নয়। এখন ওই স্থানে ২৪ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।
ডিসিসি ও বোরাকের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ১৭.২ অনুচ্ছেদ মোতাবেক লেভেল ১ ও ২ কমন ব্যবহারের জন্য রাখা হয়েছে। লেভেল-৩ ডেভেলপার কোম্পানি বোরাক রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেডকে শতভাগ দেওয়া হয়েছে। ১৬ তলা ফাউন্ডেশনসহ লেভেল-১, ২ ও ৩ তলা মার্কেট ভবন ডিসিসি নিজস্ব অর্থে নির্মাণ করেছে। তিনটি ফ্লোরের কোনও অংশই ডেভেলপারের প্রাপ্য হওয়ার কথা নয়।
সরকারের অডিট বিভাগ নিরীক্ষা করতে গেলে অডিট দলকে উদাহরণ হিসেবে ডিএনসিসির অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন ২৫-২৬ কারওয়ানবাজার বাণিজ্যিক এলাকার দ্য মুঘল হোটেল লিমিটেড ও ট্রপিকাল হোমস লিমিটেড’ এর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি দেখানো হয়। অডিট বিভাগ ওই চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখেছে দ্য মুঘল হোটেল লিমিটেড (জমির মালিক) তাদের ৯ কাঠা ১৩ ছটাক জমিতে ১৭ তলা ভবন নির্মাণ শুরু করে। বেজমেন্টসহ ৩ তলা নির্মাণের পর অবশিষ্ট তলা নির্মাণের জন্য ২০০২ সালের ১৫ আগস্ট ট্রপিকাল হোমস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তির ৭নং শর্তানুযায়ী ডেভেলপার কোম্পানির শেয়ার হবে ৫৯ শতাংশ এবং জমির মালিকের ৪১ শতাংশ। চুক্তির ১০নং শর্তে বলা হয়েছে, ‘জমির মালিক তারা তাদের খরচ দ্বারা তৈরিকৃত ভবনের বেজমেন্ট, প্রথম তলা ও দ্বিতীয় তলার পুরোটাই পাবেন। কিন্তু ডিসিসির সঙ্গে চুক্তিতে এটি নেই।’
ডিএনসিসির ২০১৩-১৪ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষাকালে অডিট বিভাগের কাছে এই অনিয়ম ধরা পড়ে। অডিট বিভাগ অনিয়মের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে জানিয়েছে দ্য মুঘল হোটেল লিমিটেড ও ট্রপিকাল হোমস লিমিটেড এবং ডিসিসি ও বোরাক রিয়েল এস্টেট (প্রা.) লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির মধ্যে সাদৃশ্য আছে। দ্য মুঘল হোটেল লিমিটেড ৩ তলা নির্মাণ করার পর ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ডিসিসি বেজমেন্টসহ তিনতলা নির্মাণ করার পর ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে। দ্য মুঘল হোটেল লিমিটেড তাদের নির্মিত বেজমেন্টসহ তিনতলা ডেভেলপারকে প্রদান করেনি, যা ডিসিসি করেছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, ডিসিসি কর্তৃপক্ষ ১৩ তলা ভবন নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছিল। চুক্তিপত্রের প্রথম শর্ত অনুযায়ী ডেভেলপার কোম্পানি বেজমেন্টসহ ১৪ তলা ভবন নির্মাণ করবে। সরেজমিন দেখা যায়, মার্কেট কর্তৃপক্ষ ১৪ তলা ভবনের পরিবর্তে ২৪ তলা মার্কেট-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণ করেছে। এসব আপত্তি বা অনিয়মের বিষয়ে অডিট অধিদফতর ডিএনসিসি থেকে কোনও জবাব পায়নি।
নিরীক্ষা মন্তব্য
নিরীক্ষা মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘জবাব প্রদান না করায় প্রমাণিত হয় যে, আপত্তি সঠিক। কারণ, শুধু ডেভেলপার কোম্পানিকে সুবিধা প্রদান করার জন্য চুক্তি সংশোধন গ্রহণযোগ্য নয়। ডেভেলপার কোম্পানি চুক্তি অনুযায়ী শুধু ১৩টি ফ্লোর নির্মাণ করবে। ১৬ তলা বিল্ডিংয়ের ৩টি ফ্লোর ডিসিসি পূর্বেই নির্মাণ করেছে বিধায় ৩টি ফ্লোরই ডিএনসিসির প্রাপ্য। চুক্তিবহির্ভূত বর্ধিত ফ্লোর নির্মাণ করার কোনও অধিকার ডেভেলপার কোম্পানির নেই।’
মন্তব্যে আরও বলা হয়েছে, ‘সিটি করপোরেশন এবং মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করে চুক্তিবহির্ভূত ফ্লোর নির্মাণের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণসহ অবৈধ ফ্লোরসমূহ ডিসিসির অনুকূলে বাজেয়াপ্তকরণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’ বর্ণিত বিষয় উল্লেখ করে ২০১৫ সালের ২৮ জুন কর্তৃপক্ষসহ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। পরবর্তীতে একই বছরের ১৩ আগস্ট তাগিদপত্র জারি করা হয়। মন্ত্রণালয় থেকে ওই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পাঠানো স্মারকে জবাব পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ব্যবস্থা হিসেবে একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবরে আধা সরকারি পত্র জারি করা হয়। কিন্তু তারও কোনও কার্যকর ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তখন যেসব চুক্তি করা হয়েছে তার সবগুলোই অসম। আমি অবাক হয়েছি মন্ত্রণালয় কীভাবে এগুলোকে সমর্থন দিয়েছে? আমি এখন জানিয়ে দিয়েছি সিটি করপোরেশনকে তার ন্যায্য হিস্যা দিতে হবে। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পদক্ষেপ নিচ্ছি।