মশাল হাতে স্লোগান স্লোগানে নারীমুক্তির দাবি জানিয়েছেন নারীরা। সহিংসতামুক্ত বাংলাদেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে লড়াই করতে হবে বলে মনে করেন তারা। বুধবার (২৫ নভেম্বর) রাতে ধানমন্ডির সাত মসজিদ সড়ক থেকে মিছিল নিয়ে স্লোগানে স্লোগানে ক্রোধ জানান নারীরা। ‘প্রজন্মান্তরের নারী মৈত্রী’ এই মিছিলের আয়োজন করে। মিছিলটি শেষ হয় সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে। এর আগে পথে কয়েকদফা প্রতিবাদী ফ্ল্যাশ মব করেন তারা।
‘পথে-ঘাটে দিনে-রাতে চলতে চাই নিরাপদে’, ‘রাষ্ট্র এবং পরিবারে সমান হবো অধিকারে’, ‘মুক্তি চাই রক্ষা নয়’, ‘তোমার আমার এক কথা সব নারীর নিরাপত্তা’, ‘সবাই মিলে এগিয়ে চলি নারী নির্যাতন বন্ধ করি’ সহ নানা স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে সন্ধ্যা সাতটার কিছু পরে ধানমন্ডি সাত মসজিদ রোডের ৫/এ সড়ক থেকে শুরু হয় মশাল মিছিল। এরপর স্লোগান দিতে দিতে মিছিলটি সাত মসজিদ সড়ক প্রদক্ষিণ করে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়ক হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এসময় সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, গত মাসে আমরা দেশজুড়ে ধর্ষণবিরোধী প্রতিবাদের উত্তাল ঢেউ বয়ে যেতে দেখেছি। ভয়াবহ ও নৃশংস ধর্ষণের খবরে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। ক্রোধে সাধারণ মানুষ নারীর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ২০০০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিনটিকে নারী নির্যাতন নির্মূলে আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করে। আমরা আমাদের নারী ও মেয়েদের রক্ষার নামে তাদেরকে পেছনে টেনে ধরি, ঘরে আবদ্ধ করি, তাদের জীবন-যাপনকে ব্যাহত করি। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবেই আমরা তাদের বাইরের জগতের সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করছি। বাড়িতে থাকলেই বুঝি বাইরের হিংস্রতা তাদের স্পর্শ করবে না। কিন্তু আমরা তাদেরকে কাদের হাত থেকে রক্ষা করছি? আমরা জানি যে, আমাদের জীবনে সহিংস পুরুষরা কোনও পরিচিত বা রহস্যময় লোক নয়, তারা আমাদেরই পরিবারের সদস্য, বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, সহপাঠী ও সহকর্মী। নারীরা-মেয়েরা রাস্তার চেয়ে বাড়িতে বেশি নিরাপদ নয়। তারা ঘরে এবং বাইরে সমানভাবেই নিগৃহীত। তাদেরকে এইভাবে রক্ষা করতে গিয়ে ফলাফল কী হলো? তারা কি সহিংসতামুক্ত জীবনযাপন করতে পারে? আমরা কি পেরেছি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? আমরা কীভাবে নারীদের রক্ষা করতে চেয়েছি? আমরা রক্ষার নামে ছোট মেয়েদের মাঝবয়সী লোকেদের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেই। একবারও মেয়েটির শারীরিক-মানসিক আঘাত এবং যন্ত্রণার কথা চিন্তা করি না।
ঘোষণাপত্রে তারা আরও বলেন, নিজ ঘর ও বাড়ি যদি নির্যাতনের আখড়া হয়, তবে নারীরা কীভাবে সুরক্ষা পাবে? তাদের রক্ষা করার জন্য তাদের চলন বলন, পোশাক পরিচ্ছদের ওপর হস্তক্ষেপ করি। কিন্তু তারপরও যখন বয়স, ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী ভেদে নারীরা সহিংসতার শিকার হযন, তখন যেই সংস্কৃতি ও সমাজ এই সহিংসতার জন্ম দেয় ও লালন করে, তার বিরুদ্ধে তৎপর না হয়ে, যে ধর্ষক তার দিকে আঙুল না তুলে, বরং সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীর ত্রুটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করি,তাকেই দোষারোপ করি। আমরা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করি। ধর্ষণসহ কোনও অপরাধ দমনে এর কোনও প্রভাব নাই। আইন করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করার পর কেবল অক্টোবর মাসেই ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার আরও ৪৪১টি খবর পাওয়া গেছে। মৃত্যুদণ্ডের বিধান তাৎক্ষণিক জনরোষ মেটাতে ভূমিকা রাখে মাত্র। এমন সুরক্ষা আমরা চাই না। সুরক্ষার নামে আমাদের প্রতি বৈষম্য করা, আমাদেরকে ত্যাগ স্বীকার করতে বলা ও সহিংসতা এড়ানোর দায় আমাদের ওপরই বর্তানো হয়। সুরক্ষার নামে কোনও প্রকার প্রতিবন্ধকতা আমাদের ওপর চাপানো চলবে না। আমরা আমাদের অধিকারের সম্পূর্ণ ও নিঃশর্ত প্রয়োগ চাই। আইন সংস্কার করে নারী-পুরুষের সম-অধিকার ও সম-মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই আমাদের জন্য একমাত্র সুরক্ষা। আমরা ভয় ভীতি ও নির্যাতন থেকে মুক্তি চাই। চাই মানুষ হিসেবে বাঁচার সম্পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার।