গত ২২ অক্টোবরে বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল হক হাওলাদারের নামে কুরিয়ারে ঢাকা থেকে একটি চিঠি যায়। নুরুল হক হাওলাদার প্রায় ১০ বছর আগে মারা গেছেন। তার ছেলে হারুন অর রশীদ চিঠিটি খোলেন। চিঠি খুলে তিনি দেখতে পান, ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের নাম ব্যবহার করে পাঠানো হয়েছে এটি। চিঠিতে লেখা রয়েছে, ‘ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষ থেকে সরাসরি নিয়োগ প্রসঙ্গে শুভেচ্ছা জানাই। বর্তমানে ডাচ-বাংলা ব্যাংকে বিশেষ সুযোগ থাকায় ওই কোম্পানি আপনার মাধ্যমে দুই জন সুপারভাইজার ও একজন গার্ড নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক।’
কম্পোজ করা লাল ও সবুজ কালির এক পাতার চিঠিতে এরপরই প্রার্থীর শারীরিক গঠন, উচ্চতা ও শিক্ষাগতা যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। প্রার্থীদের নিজ নিজ এলাকায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ ও ব্রাঞ্চে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। এছাড়াও ভালো বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
এই চিঠি পেয়ে হারুন অর রশীদ প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ করেন। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের চাকরি হবে বলে অনেক তরুণই তাদের ইচ্ছার কথা জানায়। চিঠিতে যোগাযোগের জন্য যে মোবাইল নম্বর দেওয়া হয়েছে সেই নম্বরে ফোন করে তারা কথা বলেন।
হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তার কাছে অনেক চিঠিপত্র ও কাগজপত্র আসতো। সরকারি চিঠিও আসতো। আমরা ডাচ-বাংলা ব্যাংকের লোগো ও চিঠি দেখে সবাই চাকরির জন্য চেষ্টা করেছি। আমি নিজে গার্ডে এবং আমার এলাকার দুই জন জাকারিয়া ও সৌরভ সুপারভাইজার পদে আবেদন করার জন্য ওই নম্বরে ফোন দেই। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জানানো হয়, তিনি কোম্পানির এমডি। চাকরির জন্য ছবি, চেয়ারম্যান সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পাঠাতে হবে। পাশাপাশি সুপারভাইজার পদের জন্য খাওয়া ও পোশাক বাবদ তিন হাজার টাকা এবং গার্ডের জন্য দুই হাজার টাকা পাঠাতে হবে। এসব কাগজপত্র, টাকা সরাসরি বা মেইলেও পাঠানো যাবে।’
তিনি বলেন, ‘জাকারিয়া ও সৌরভ সুপারভাইজার পদের জন্য আবেদন করে এবং আমি গার্ডের পদে। মেইলেই সবকিছু পাঠিয়ে দেই। কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী আমরা পুরো টাকা দেইনি। আমরা তার অর্ধেক টাকা, অর্থাৎ সুপারভাইজার পদের দুই জন মিলে তিন হাজার এবং আমি এক হাজার টাকা বিকাশ করে দেই।’
২২ অক্টোবর টাকা দিয়ে এই তিন তরুণ ইমেইলে চাকরির জন্য আবেদন করেন। পরে ২৪ অক্টোবর ওই কোম্পানির নামে তিন জনের নিয়োগপত্র পাঠানো হয়। এ সময় বাকি টাকাও বিকাশ করতে বলে দেওয়া হয়। বলা হয়, টাকা পাঠানো হলে ঢাকা থেকে তাদের কোম্পানির দুই জন লোক বরগুনা যাবেন। তারা এই তিন তরুণকে প্রশিক্ষণ দেবেন। টাকা না দিলে তারা যাবেন না। এর মধ্যে বামনায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথে খোঁজ নেন হারুন অর রশীদ। ওই বুথ থেকে জানানো হয়, ডাচ-বাংলা ব্যাংক এমন কোনও নিয়োগ দেয় না। ওই চিঠিটি ভুয়া।
এরপর ওই তিন তরুণ বুঝতে পারেন তারা প্রতারিত হয়েছেন। তারা কথিত ডাচ-বাংলা ব্যাংকের পাঠানো চিঠিতে থাকা মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিয়ে চাকরি করবেন না বলে টাকা ফেরত চান। তবে তারা টাকা ফেরত দেবে না বলে হুমকি দিয়ে দেয়।
ভুক্তভোগী অপর তরুণ মো. সৌরভ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি পরে বুঝতে পারি প্রতারণার শিকার হয়েছি। তখন টাকা ফেরত চাইলেও ওই চক্র আর টাকা ফেরত দেয়নি। তারা হুমকি দিয়েছে, পারলে টাকা তুলে নাও।’
ওই এলাকার আরও এক মেম্বারের কাছেও এমন চিঠি এসেছে। চিঠির বক্তব্য সব একই। তাকেও তিন জন লোক পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এর আগে যাত্রীবাহী যানবাহনে চাকরির বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, কখনও জাতীয় দৈনিকেও এসব চাকরির বিজ্ঞাপন দিয়ে নিয়োগের কথা বলা হতো। বেকার মানুষ আবেদন করার পর তাদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ, জামানত, পোশাক, খাওয়া বাবদসহ বিভিন্ন অজুহাতে নেওয়া হতো টাকা। এখন এই প্রতারণার কৌশল পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ বিভাগের এআইজি সোহেল রানা জানান, এ রকম বেশ কিছু ঘটনায় প্রতারকদের আটক করা হয়েছে। এসব প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধেও দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। পাশাপাশি চাকরি প্রার্থীদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
প্রতারক চক্রটি চিঠিতে উল্লেখ করেছে, তাদের প্রধান কার্যালয় মতিঝিলে। তবে বিস্তারিত কোনও ঠিকানা দেওয়া হয়নি। তবে চিঠির শেষাংশে একটি ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে, ডাচ বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের নিয়োগ বিভাগের কার্যালয়, করপোরেট অফিস- হাউজ নং- ৩২/২, আশুলিয়া রোড, আশুলিয়া ঢাকা-১৩৫১। ঠিকানার নিচে একটি মেইল আইডি ও ডাচবাংলা ব্যাংকের ওয়েবসাইট অ্যাড্রেস লেখা রয়েছে। তবে অফিসে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে তা সঠিক নয়।
ডাচ-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা সগির আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ধরনের প্রতারণার কথা আমরা প্রায়ই শুনি। এজন্য আমরা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেই। ব্রাঞ্চ ও এটিএম বুথেও আমাদের সতর্ক বার্তা ঝুলানো থাকে। ডাচ বাংলা ব্যাংক এভাবে কাউকে কখনও নিয়োগ দেয়নি। এটা পুরোটাই প্রতারণা।’ কেউ এরকম নিয়োগের প্রস্তাব দিলে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।