সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকারের চাপে রয়েছে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলো। এ সব দলের শীর্ষ নেতারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সরকারের চাপ বিগত কয়েক বছর ধরেই আছে। এর মধ্যে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়ে দায়ের হওয়া শত শত মামলায় গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন তারা।
তবে হেফাজত-পরবর্তী সময়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ধর্মভিত্তিক দলগুলোর কিছু নেতা কর্মসূচি না দেওয়ার শর্তে সরকারের কাছ থেকে নানা সুবিধা নেন। এক পর্যায়ে বিষয়গুলো সামনে চলে আসে। গোপনে দুই জোটের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষার কৌশলও নেন কয়েকজন নেতা।
জানা গেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটে রয়েছে বেশিরভাগ ধর্মভিত্তিক দল। ইসলামী ঐক্যজোট, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিস রয়েছে এই জোটে। তবে ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জোটের সঙ্গে নেই।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন। এছাড়া ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামী পার্টি (বিইউআইপি), আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতসহ বেশকিছু দল জোটে না থাকলেও সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভালো।
২০ দলীয় জোটের প্রতিষ্ঠাকালীন শরিক ইসলামী ঐক্যজোট। এ দলের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ একই সঙ্গে নেজামী নেজামে ইসলাম পার্টিরও নেতা। দলটির মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ। হেফাজতের আলোচিত এই নেতা বিভিন্ন মামলার আসামি। বছরজুড়ে কর্মসূচি না থাকলেও শেষ ভাগে বিভিন্ন জেলায় সম্মেলন করে দলটি। পদে থাকতে তৎপর হয়ে ওঠেন শীর্ষ নেতারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামী ঐক্য জোটে পদ নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। আবুল হাসানাত ও তার ভগ্নিপতি সাখাওয়াত হোসাইনের অঘোষিত বিরোধ রয়েছে আবদুল লতিফ নেজামী ও মুফতি ফয়জুল্লার সঙ্গে। মুফতি ফয়জুল্লার ও আবুল হাসানাত উভয়েই দলের মহাসচিব হতে চান।
হেফাজত মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারের চাপ অতীতেও ছিল। তবুও ইসলামী ঐক্য আরও শক্তিশালী হবে। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের দায়িত্ব রদবদল হয়। দলে কোন্দল থাকার কারণ নেই।
২০-দলীয় জোটের অন্য শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের প্রকাশ্য কার্যক্রম ছিল না বছরজুড়েই। গত ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ত্রিবার্ষিক কাউন্সিলে দলের পদ পাওয়া নিয়ে তিন গ্রুপের লবিংয়ে দলটি ভাঙনের মুখে পড়েছে। কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ২৪ বছর ধরে থাকা মাওলানা মুফতি ওয়াক্কাসের মহাসচিব পদ হারান।পরে তিনি নির্বাহী সভাপতির পদ পান। বর্তমানে নূর হোসাইন কাসেমী ও মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাসের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে।
মুফতি ওয়াক্কাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দল নিজস্ব গতিতে এগুচ্ছে। বিরোধী সব দলই সরকারের চাপে রয়েছে। এর মানে এই নয় যে সবাই নিষ্ক্রিয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে সরকারি দলের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার। ঘরোয়া অনুষ্ঠান ছাড়া বড় কোনও কর্মসূচি ছিল না দলটির। দলের মহাসচিব মাওলানা মাহফুযুল হক বলেন, শুধু ধর্মভিত্তিক দল নয়, সরকারের বাইরের সব দলই চাপের মধ্যে আছে। এই রকম পরিস্থিতিতে কর্মসূচি নেওয়া খুব কঠিন।
তবে চরমোনাইপীরের দল ইসলামী আন্দোলনে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নেই। দলটির ওপর সরকারের তেমন চাপ না থাকায় সারাদেশে ওয়াজ মাহফিলসহ সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত ছিল।
দলটির ঢাকা মহানগরী সেক্রেটারি আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠায় ইসলামী আন্দোলন কারও সঙ্গে আপস করে না। সারাদেশে আমাদের কার্যক্রম চালু রয়েছে।
বছরজুড়েই নিষ্ক্রিয় ছিল মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। দলটির মহাসচিব জাফরুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে ও নাতিরা দলের পদ নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন। হাফেজ্জী হুজুরের বড় ছেলে আহমদুল্লাহ আশরাফ দলের আমির থাকলেও বার্ধক্য ও অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি নিষ্ক্রিয়। আহমদুল্লাহ আশরাফ দায়িত্ব পালনে অক্ষম হওয়ায় তার ভাই আতাউল্লাহ দলের আমির নির্বাচিত হন। যদিও আশরাফের বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ মিয়াজি মহাসচিব হতে নানা তৎপরতা চালান। নানামুখী কোন্দলে দলটি এখন নিষ্ক্রিয়।
এ প্রসঙ্গে জাফরুল্লাহ খান বলেন, কিছু লোক ক্ষমতার লোভে দলের মধ্যে অপতৎপরতা চালান, যদিও এটি এখন আর নেই।অনেকে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন, যা ভিত্তিহীন।
এদিকে আওয়ামী লীগঘেঁষা ধর্মভিত্তিক দলগুলো সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কর্মসূচি পালন করে আসছে। ক্ষমতাসীন জোটের শরিক বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশনের তেমন তৎপরতা ছিল না। এ বিষয়ে তরীকত ফেডারেশনের মহাসচিব এম এ আউয়াল বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে থাকলেও আমাদের দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে নেই।দেশজুড়েই কর্মসূচি পালিত হয়েছে।’
ওয়াজ-মাহফিলে বছর কেটেছে ২০১২ সালে গঠিত কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক দল হেফাজতে ইসলামের। ২০১৩ সালে ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করে দেশ-বিদেশে আলোচনায় আসে সংগঠনটি। এ বছর বিবৃতি দিয়েই কার্যক্রম অব্যাহত রাখে দলটি।
এ প্রসঙ্গে হেফাজতের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, হেফাজত তার নিজের গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, 'আওয়ামী লীগের নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ আছে। কোনও দল বা জোট ভাঙার মতো কাজ আওয়ামী লীগে করে না। আর কেউ অপরাধ করলে, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে রাজনীতি কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
/সিএ/এমএসএম/ এমএনএইচ/আপ-এনএস/