‘রাসায়নিক গুদাম সরাতে ব্যর্থতার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন’

পুরান ঢাকার আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে  বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের-বিআইপি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাসায়নিক গুদাম সরাতে ব্যর্থতার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

শনিবার (২৪ এপ্রিল) বিআইপি’র সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও  বলা হয়,  এই ঘটনাকে দুর্ঘটনা না বলে ব্যবসায়ী, বাড়ির মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের অতি মুনাফা লাভের প্রবণতা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার সম্মিলিত ফলাফল বলে মনে করে বিআইপি।

বিআইপি জানায়, পুরান ঢাকা বোমার ওপর বসবাস করছে— এই চরম সত্যটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সসহ দেশের দায়িত্বশীল সকল মহল থেকে বারবার বলা সত্ত্বেও এবং নিমতলী ট্র্যাজেডির ১১ বছর পরেও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরেনি।  মানুষের জীবন ও সম্পদকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দেওয়া হলে বর্তমানে এই পরিস্থিতি হওয়ার কথা ছিল না। মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার যে দায় আছে, তাকে উপেক্ষা করে জনস্বার্থ ও মানুষের জান-মাল রক্ষায় সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি কেউ রোধ করতে পারবে না।

রাসায়নিক গুদাম যে কত ভয়ংকর হতে পারে, ২০২০ সালে লেবাননের বৈরুতের বিস্ফোরণ তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ। পুরান ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় যেসব বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থের মজুত আছে, তা যেকোনও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটানোর শঙ্কা তৈরি করে রেখেছে সার্বক্ষণিকভাবে। এই বাস্তবতায় নিমতলী, চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের পর সরকার ঘোষিত নির্দেশনা কেন বাস্তবায়িত হলো না এবং রাসায়নিক কারখানা সরানোর উদ্যোগ কেন বাস্তবায়ন করা যায়নি, সেটা অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, আমরা অবগত আছি যে, নিমতলী ও চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদমের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান বন্ধ করেছে সিটি করপোরেশন, যেটা সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম ও কারখানার নজরদারি কার্যক্রম চালানো  সিটি করপোরশন এবং ওয়ার্ড কাউন্সিল অফিস, কারখানা অধিদফতর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিস্ফোরক অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও তা পালনে সক্ষম হয়নি তারা।

পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলোর অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও আদর্শগত মান অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। পাশাপাশি পুরান ঢাকায় বর্তমান পরিকল্পনা অনুসারে মিশ্র ব্যবহারের মানদণ্ড অনুসারে একই ভবনে আবাসন ও বিপজ্জনক মিশ্র ব্যবহারের কোনও অনুমোদন না থাকা স্বত্ত্বও এ ধরনের বিপজ্জনক সহবাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। মাস্টার প্ল্যানে নির্দেশিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার ব্যত্যয় করে এসব ভবনে অতি মুনাফার জন্য রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম তৈরি করা হয়েছে। দেশের রাজধানীর মূল কেন্দ্রে থেকে এই ধরনের বিপজ্জনক ব্যবসা কীভাবে দিনের পর দিন চলতে দিচ্ছি, সেটা আমাদের আধুনিক ও বসবাসযোগ্য শহর গড়বার অঙ্গীকারকে মারাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

কেরানীগঞ্জে বিসিক শিল্পনগরীর পাশে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে রাসায়নিক গুদাম সরানোর যে প্রস্তাবনা ছিল, ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্লটভিত্তিক শিল্প এলাকা তৈরি করে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা আমাদের রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের কাজকে বিলম্বিত করছে। আমাদের দেশে ভূমি স্বল্পতার বাস্তবতায় সকলকে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ না করলে এ ধরনের বিপর্যয় আরও দেখতে হবে সামনে।

পুরান ঢাকার অনেক বাড়ির মালিক অধিক মুনাফা লাভের আশায় অনুমোদনহীনভাবে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাকে ভাড়া দিয়ে আসছেন, অথচ তাদের অনেকেই এখন এলাকা পরিবর্তন করে পরিকল্পিত এলাকায় ঝুঁকিমুক্ত ভবনে বসবাস করছেন। এই ভবন মালিকদের অচিরেই আইনের আওতায় না আনা হলে এই সংস্কৃতি চলতেই থাকবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে আবাসিক ভবনে বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামজাতকারী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত। সর্বোপরি, সরকারি সংস্থা ও দফতরগুলোর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কর্তব্য পালনে গাফিলতি থাকলে, সে ব্যাপারে তদন্ত সাপেক্ষে আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।