ব্যক্তিগত গাড়ি চালক ও দুই কাজের মেয়ের পরিকল্পনায় খুন হন সাবেক কর কমিশনার আবু তাহের (৭০)। এই ঘটনায় নিহতের গাড়ি চালক ও দুই কাজের মেয়েসহ দশজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. ইকবাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গত বছরের পহেলা মার্চ পূর্ব রামপুরার ৩৪৭ নম্বরের নিজ বাসায় খুন হন সাবেক ট্যাক্স কমিশনার আবু তাহের। ওই বাসায় তিনি তার স্ত্রী রোকেয়া তাহেরসহ (৬০) বসবাস করতেন। এই ঘটনায় নিহতের ছোট ছেলে এটিএম আরিফুল হক বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেন। মামলাটি ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) শরীফ রফিকুল ইসলাম তদন্ত করেন।
মামলার তদন্তের দায়িত্বে পান এসআই শরীফ। তিনি তদন্ত করে হত্যাকাণ্ডে দশজনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পেয়েছেন। তাদের আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন তিনি।
এ মামলার আসামিরা হলেন, আবু তাহেরের গাড়িচালক নাসির, রাসেল, রুস্তম, সোহেল, আমির হোসেন, মাসুদ, সুজন, নুর আলম এবং দুই কাজের মেয়ে নুরজাহান ও সেলিনা।
এসআই শরীফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আবু তাহেরের বাসায় নুরজাহান ও সেলিনা নামে দুই গৃহপরিচারিকা ছিল। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিল নাসির। নাসির গাড়ির গ্যারেজের পাশের একটি কক্ষে থাকতেন। কিন্তু প্রায়ই কাজে ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ছিল নাসিরের বিরুদ্ধে। আবু তাহের ও তার স্ত্রী বৃদ্ধ হওয়ায় তাদের কথা শুনতেন না নাসির। এজন্য নাসিরকে চাকরিচ্যুত করেন আবু তাহের। এতে নাসির ক্ষুব্ধ হন। এরপর তিনি আবু তাহেরকে হত্যার হুমকি দেন। এই ঘটনায় নাসিরের বিরুদ্ধে আবু তাহের রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।’
এসআই শরীফ আরও বলেন, ‘চাকরি হারাবার পর নাসির আবু তাহেরকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। কথিত এক খালাতো ভাই রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেমে পড়েন তিনি। অপর আসামিদের স্বর্ণালংকারের লোভ দেখিয়ে হাত করে ফেলেন নাসির। ১ মার্চ সন্ধ্যায় তারা মেরাদিয়া এলাকার বালুর মাঠে মিলিত হয়ে একটি সভা করেন। এর আগে কাজের মেয়েদের সহযোগিতায় বাসার প্রধান গেটের চাবি বানিয়ে নেন নাসির। নাসিরের সঙ্গে কাজের মেয়ে নূরজাহানের প্রেমের সম্পর্ক ছিল।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের আগে ওই বাসাটি রেকিও করেন তারা। ১ মার্চ রাত ৯ টার আগেই ডাকাতির সব পরিকল্পনা করে ফেলে তারা। ডাকাতির সময় কার কি কাজ তাও ভাগ করে দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী দুই কাজের মেয়ে মোবাইল ফোনে বাড়ির পরিস্থিতি জানান নাসিরকে। ঠিক হয় বাসার ভেতরে ঢুকে ডাকাতি ও খুন করবেন নাসির, রাসেল, আমির, রুস্তুম ও সোহেল। আর ডাকাতির সরঞ্জাম বহন করবেন নুর আলম, মাসুদ ও সুজন। সেই অনুযায়ী তারা রাত ১২ টার দিকে ওই বাড়ির সীমানা প্রাচীরের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর ৩ টার দিকে নাসির, রাসেল, আমির, রুস্তুম ও সোহেল বাড়ির প্রধান গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। বাসার দ্বিতীয় তলায় গিয়ে নূরজাহানকে ফোন দেন তারা। কিন্তু ভেতর থেকে বাসা তালা দিয়ে চাবি রাখা হতো তাহেরের স্ত্রী রেবেকার কাছে। তাই নূরজাহান দরজা খুলতে পারেননি। এরপর ডাকাতরা বাড়ির পেছনে চলে যায়। দুই কাজের মেয়ে জানালা খুলে দিলে তারা জানালার দুইটি গ্রিল ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর গৃহকর্ত্রী রেবেকাকে কাজের মেয়েদের দিয়ে ডাক দিয়ে ঘুম থেকে তুলে তাদের রুমের দরজা খোলানো হয়। এসময় ডাকাতরা তাকে ধরে বেঁধে মুখে স্কচটেপ পেঁচিয়ে দেয়। এরপর খাটে শুয়ে থাকা আবু তাহেরের বুকের ওপর উঠে বসেন রুস্তুম ও নাসির। তারা তাহেরের গলা টিপে ধরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। এরপর তার হাত-পায়ের রগ কেটে দেয় ডাকাত দল। গৃহকর্ত্রীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে তারা বাসার ভেতরে লুটতরাজ চালায়। এসময় ১২ ভরি স্বর্ণ, তিনটি মোবাইল ফোন ও নগদ ৪৫ হাজার টাকা নিয়ে তারা পালিয়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত ৩ টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত তারা ওই বাসার ভেতরেই ছিল। এমনকি ফ্রিজে থাকা খাবারও খায় তারা। ভোর ৫ টার দিকে গৃহকর্ত্রী রেবেকার কাছ থেকে চাবি নিয়ে তারা সামনের দরজা খুলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শরীফ আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের পর দুই কাজের মেয়ে ঘটনাটি ডাকাতি বলে এড়িয়ে যায়। ডাকাতরা সবাই মুখোশ পড়া থাকায় তাদের চিনতেও পারেনি বলে জানিয়েছিলেন তারা। কিন্তু মোবাইল কললিস্ট ধরে নাসিরসহ সবাইকে গ্রেফতার করা হলে বেরিয়ে আসে কাজের মেয়েদের ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা।
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ১০ আসামির মধ্যে ৯ জনকে গ্রেফতার করা হছে। এদের মধ্যে আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
নিহতের ছেলে এটিএম আরিফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা ধারণাও করতে পারেনি কাজের মেয়েরা এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। তারা ঠাণ্ডা মাথায় আমার বাবাকে খুন করেছে। আমরা এর বিচার চাই।’
/এআরআর/টিএন/