ট্যানারি সরানোর আল্টিমেটাম

শিল্পমন্ত্রীর নির্দেশ পাত্তা দিচ্ছেন না মালিকরা

রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ট্যানারি কারখানাগুলো স্থানান্তর না করলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু। কিন্তু মন্ত্রীর এই নির্দেশের কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি হাজারীবাগে। সোমবার হাজারীবাগে গিয়ে দেখা গেছে, নিত্যদিনের মতো ট্যানারিগুলোতে কাজ চলছে। কোথাও কোথাও পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত করা হচ্ছে। চলছে নতুন মেশিন স্থাপনের কাজও। অথচ বাংলাদেশ ট্যানারিজ অ্যাসোসিয়েশন বারবার ট্যানারি না সরানোর জন্য সরকারকেই দোষারোপ করছে।

জানা গেছে, রবিবার শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে চলতি ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে শিল্পখাতের উন্নয়নে সরকার গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম মূল্যায়ণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালক ও সংস্থার প্রধানদের নিয়ে আয়োজিত সভায় ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তর না করলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেন শিল্পমন্ত্রী। একই সঙ্গে ট্যানারি মালিক বরাবর উকিল নোটিশ পাঠানোর নির্দেশনা দেন বিসিককে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোনও ট্যানারি মালিক কারখানা স্থানান্তরে ব্যর্থ হলে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে তার নামে বরাদ্দ করা প্লট বাতিলেরও নির্দেশ দেন তিনি।ট্যানারিতে কাজ করছেন শ্রমিকরা
তবে সোমবার সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজারীবাগের শিকারিটোলায় আনোয়ার ট্যানারিতে প্রতিদিনের মতোই শ্রমিকরা কাজ করছেন। কারখানাটির একটি মেশিন সচল, একটির মেরামতের কাজ চলছে। একই সঙ্গে কারখানায় নতুন মেশিন স্থাপনেরও কাজ চলছে। জানতে চাইলে সেখানকার শ্রমিক রফিকুল বলেন, ট্যানারি সরানোর কথা আমরাও খবরে জেনেছি, কিন্তু মালিক আমাদের ট্যানারি সরানোর কথা বলেননি। আর চাইলেই কি তিনদিনের মধ্যে সরানো সম্ভব?
শুধু আনোয়ার ট্যানারি নয়, হাজারীবাগের সবগুলো ট্যানারিতেই শ্রমিকরা কাজ করছেন। চৌধুরী লেদার অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডে গিয়েও দেখা যায় মেশিন চলছে, প্রত্যেক শ্রমিক কাজ করছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির কোনও কর্মকর্তা এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
আর এম এম লেদার ইন্ডাস্ট্রিজের গেটে দেখা গেলো একজন নিরাপত্তা কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারখানা চালু আছে, ভেতরে সব শ্রমিক কাজ করছেন। সাভারে সরানোর জন্য তো কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কবে নেওয়া হবে সেটা মালিক বলতে পারবেন, আমরা এতো কিছু জানি না।

শুধু হাজারীবাগ নয়, রাজধানীর লালবাগসহ পুরান ঢাকার ট্যানারিগুলোতেও দেখা যায়নি স্থানান্তরের উদ্যোগ। তবে এলাকার মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ট্যানারি স্থানান্তরে মন্ত্রীর ঘোষণা। আবুল কালাম আজাদ নামের হাজারীবাগের এক বাসিন্দা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অনেক দিন থেকেই তো শুনছি সব ট্যানারি সাভারে চলে যাবে। কিন্তু এ ঘোষণার পরেও শিকারিটোলায় একাধিক নতুন ট্যানারি হয়েছে। সরকার কঠোর হয়ে যদি সরাতে পারে, তবেই স্বস্তি।  

সাত বছর আগে বাড়ি বানিয়ে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন মোহাম্মদ মাহবুব আলম। বাড়ির আশপাশে ট্যানারির বর্জ্য দেখিয়ে তিনি বলেন, এমন পরিবেশ বসবাসের উপযুক্ত নয়। রাস্তা-ড্রেন কোনও স্থান বাদ নেই যেখানে ট্যানারির বর্জ্য নেই। চামড়ার দুর্গন্ধ, কেমিক্যালের গন্ধ সব মিলিয়ে এখানকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে গেছে।  কোরবানির সময় এখানকার পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হয়। সরকার ব্যবস্থা না নিলে সহজে ট্যানারিগুলো সরানো যাবে না।  

জানা গেছে,সাভারে বাস্তবায়নাধীন চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের ট্যানারির বর্জ্য পরিশোধনসহ আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তরের জন্য সরকারের মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থও দিয়েছে সরকার।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন সময়ে হুঁশিয়ারি দিয়েও হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরানো যায়নি। বিসিক ও ট্যানারি মালিকদের দুই সংগঠনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ট্যানারি মালিকদের ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হাজারীবাগের সব ট্যানারি সাভারে স্থানান্তরের কথা ছিল। কিন্তু দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে সর্বশেষ গত বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে হাজারীবাগ থেকে কারখানা স্থানান্তরে ট্যানারি মালিকদের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানারিজ এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিল্পমন্ত্রীর ঘোষণা নিয়ে ভুল বোঝাবোঝির সৃষ্টি হয়েছে। আসলে দশ-বারোটি ট্যানারি মালিক স্থানান্তরের কাজ ঠিক মতো করছেন না, তাই মন্ত্রী তাদের জন্য এই নির্দেশ দিয়েছেন। এই ঘোষণা সবার জন্য নয়। আমরা এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।

তবে ভিন্ন কথা বললেন বাংলাদেশ ট্যানারিস এসোসিয়েশনের মহাসচিব মোহাম্মদ সাখাওয়াত উল্লাহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে স্থানান্তর কোনভাবেই সম্ভব নয়। উনি আসলে কী উদ্দেশ্যে একথা বলছেন জানি না। তবে, শুনেছি কয়েকটি ট্যানারির মালিক স্থানান্তরের কাজ খুবই ধীর গতিতে করছেন। তাদের শাসাতে হয়তো একথা বলেছেন মন্ত্রী।

মোহাম্মদ সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, আমারা সেখানে গিয়েই আর কী করবো। সরকার বর্জ্য শোধন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ একটি চীনা প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে। এখনও সে কাজ শেষ হয়নি। আমরা সাভারে গিয়ে কাজ শুরু করলে কোথায় বর্জ্য ফেলবো? আমরা  মাত্র কোরবানির চামড়া নিয়ে কাজ শুরু করেছি, এখন আমাদের হাতে অনেক কাজ। এখন এমন পরিস্থিতি হলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে আমাদেরকে।

 

/সিএ /এমএসএম/টিএন/