তারা পালিয়ে বাঁচলেন

আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানের পর থেকে প্রগতিশীল নারী শিক্ষক, শিল্পী, সাংবাদিক, খেলোয়াড় কাবুল থেকে পালিয়ে পৃথিবীর নানা প্রান্তে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পরিবারকে পেছনে ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন—আসলে কী ঘটছে আফগানিস্তানে, বিশেষত নারীদের সঙ্গে। তারা এও বলছেন, যারা পালিয়েছেন তারাই ভালো আছেন, তারাই বেঁচে গেছেন।

‘হুইলচেয়ার বাসকেট বল টিম’-এর ক্যাপ্টেন বায়াত কাবুল ছাড়ার বিষময় বর্ণনা দেন। তালেবানদের ভয়ে তিনি তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কাবুল ত্যাগ করেন। স্পেনের পথে রওনা হওয়ার আগে তাদের দুই দিন এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। স্পেনে পৌঁছে তিনি কথা বলেন তার এই পলাতক জীবনের যাত্রা নিয়ে। ক্যাপ্টেন বায়াত বলেন, ‘এটি আসলেই সবার জন্য খুবই বিপজ্জনক ছিল, ভয়ের ছিল। তালেবানরা এলোপাতাড়ি গুলি করছিল। আমি আর আমার স্বামী রমেশও এর শিকারে পরিণত হতে চলেছিলাম। আমি খুব ভয় পেয়েছি এবং আমার স্বামীকে বলছিলাম, দেখো এরা কত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভয়াবহতা দেখলে চোখের পানি আটকে রাখতে পারবেন না।’ গত শাসনামলে বায়াতের বয়স যখন দুই, তখন একটি রকেট হামলা হয়েছিল তার পরিবারের ওপরে। সে হামলায় তার ভাই আহত হয়েছিলেন এবং বায়াতের মেরুদণ্ডে আঘাত লাগায় আজীবনের জন্য প্রতিবন্ধী জীবন পেয়েছিলেন।

হুইলচেয়ার বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন বায়াততিনি বলেন, ‘তালেবানদের নিয়ে আমাকে খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কারণ, তারা এলেই আমার জীবন বদলে যায়। তারা ক্ষমতায় আসায় আমাদের ভীষণভাবে দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছে। সারা জীবনের মতো পঙ্গুত্ব বরণ করি। আমার কিছু করার ছিল না। সারা জীবনের মতো আমার এই প্রতিবন্ধী জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। নারীদের জন্য তালেবানি শাসন এক বিভীষিকা। আপনাকে কিছুই করতে দেবে না, আপনাকে ঘরে থাকতে হবে এবং নিজের এই অথর্ব জীবন বয়ে বেড়াতে হবে। যার মানে আপনি কোনও গুরুত্বই বহন করেন না। তারা মনে করে, নারীদের এই সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করণীয় নেই। আমরা যখন একসঙ্গে বসার সুযোগ পাই, তখন আমাদের সেখানে ফেলে আসা পরিবার নিয়ে কথা বলি। কীভাবে আমরা তাদের (পরিবারকে) সাহায্য করবো। কীভাবে আমরা তাদের নিরাপদে রাখতে পারবো। তাদের কোনও নিরাপত্তা নেই। তারা ভীষণ বিপদে রয়েছে, সব আফগানিস্তানের মানুষের মতো।’

আতেফা শাফাই সবেমাত্র কাবুল থেকে যুক্তরাজ্যে এসেছেন। এই নারী অধিকার প্রচারককে তার বোনকে সঙ্গে নিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পরিবারের বাকিরা পিছিয়ে গেছেন বলে সেটা আর সম্ভব হয়নি। এখন পরিবারের সবাই মিলে আত্মগোপনে আছেন। তিনি আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কঠিন যাত্রার কথা স্মরণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি কাবুল থেকে এখানে এসে পৌঁছেছি দুই দিন হলো এবং গত দুই সপ্তাহে প্রথমবারের মতো স্বস্তিবোধ করছি। কাল রাতে ঘুমাতে পেরেছি। কিন্তু আমি আমার পরিবার এবং আফগান জনগণের জন্য ভীষণ চিন্তিত, যারা একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে। মানসিকভাবে আমি এখনও থিতু হতে পারছি না। কেননা, আফগানিস্তানে আমি পরিবার ফেলে এসেছি এবং তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। প্রতিনিয়ত নিজেদের লুকানোর চেষ্টা করেছেন। আমি যখন পরিবারকে বিদায় জানিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে আসি, তখন পর্যন্ত আমি জানি না দেশত্যাগ করতে পারবো কিনা। কেননা, আপনারা সবাই দেখেছেন বিমানবন্দরের পরিস্থিতি কী ছিল। সেখানে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষারত ছিলেন এবং যারা এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করছিলেন, তাদের অনেককেই হত্যার অভিযোগও পাওয়া গেছে।’

নারী অধিকারকর্মী আতেফা শাফাই

আতেফা ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে তার বোন আফগানিস্তানে থাকলে তাকে তালেবান জঙ্গি বিয়ে করতে বাধ্য করা হবে।

‘আমার জন্য সেখানে জীবনযাপন করা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার ছিল। এক কথায় মর্মান্তিক এবং অবিশ্বাস্য।’ আফগান ‘দ্য ভয়েস’-এর বিচারক আরিয়ানা সাঈদ ছদ্মবেশে আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কারণ, তালেবানরা দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তিনি নিরাপত্তার আশঙ্কায় ছিলেন। তিনি বলেছেন, তালেবানরা ক্ষমতা নেওয়ার পর রাতারাতি সব বদলে গেলো। আমাদের জীবন ভয়ংকর বিভীষিকাময় হয়ে উঠলো। আমার হোটেল থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছানোটাই সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কেননা, রাস্তায় রাস্তায় তালেবান চেকপোস্ট ছিল এবং তাদের টার্গেট ছিল নারীরা। পুরো সময়টা জীবিত ধরা পড়ে যাওয়ার শঙ্কা নিয়ে ছুটে চলেছি। আমরা যারা পালিয়ে এসেছি তারা বেঁচে আছি। কিন্তু সেখানে আমাদের পরিবার, দেশের জনগণ কতদিন নিজেদের লুকিয়ে বাঁচবেন জানি না।