কন্যাশিশু নির্যাতন রোধে ১০ সুপারিশ

একটি সুস্থ-সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কন্যাশিশুর অধিকার, তাদের শিক্ষা, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণসহ নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। বৃহস্পতিবার (৩০ সেপ্টেম্বর)  জাতীয় প্রেস ক্লাবের আবদুল সালাম হলে ‘কন্যাশিশু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন-২০২১’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তারা এ দাবি জানায়।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি জানান, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশের থানাগুলোতে ২৬ হাজার ৬৯৫টি ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩৩১টি, ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৬৮৩টি, ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৬৯৫টি, ২০১৯ সালে ৬ হাজার ৭৬৬টি এবং ২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৬ হাজার ২২০টি মামলা দায়ের করা হয়। প্রতিবছর এই মামলার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে।

লিখিত প্রতিবেদনে তিনি আরও জানান, কন্যাশিশুর প্রতি বিভিন্ন মাত্রায় যে ধরনের নির্যাতন দেখা যায় তা হলো: যৌন হয়রানি ও নির্যাতন; এসিড আক্রমণ; অপহরণ ও পাচার; বাল্যবিবাহ; যৌতুক; ধর্ষণ; গৃহ শিশু শ্রমিক নির্যাতন; শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক কন্যাশিশু নির্যাতন; আত্মহত্যা; হত্যা এবং পরিত্যক্ত কন্যাশিশু।

অনুষ্ঠানে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার সঞ্চালকের বক্তব্যে বলেন, ‘রাজনৈতিক নানা কারণে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা আমাদের দেশে এক নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের সব ক্ষেত্রেই দলীয়করণ হয়ে গেছে। এটার মাশুল আমরা দিচ্ছি। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

শিশুকন্যার প্রতি নির্যাতন রোধে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম থেকে ১০টি সুপারিশ করা  হয়। তা হলো:

১. শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার সব ঘটনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ শেষ করতে হবে।

২. উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন রোধে সর্বস্তরের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নামে একটি আইন জরুরি ভিত্তিতে প্রণয়ন করতে হবে।

৩. কারো হেফাজতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে, ঘটনার শিকার নারী ও কন্যার পরিবর্তে তাকে প্রমাণ করতে হবে যে সে এ ঘটনা ঘটায়নি, এ সম্পর্কিত প্রচলিত আইনের বিধান সংশোধন করতে হবে।

৪. শিশুদের ডিভাইস নির্ভরতায় তাদের বিপদগামী থেকে বাঁচাতে এবং সঠিক পথে পরিচালনার জন্য উচ্চপর্যায়ের আইসিটি বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় সব ধরনের পর্নোগ্রাফিক সাইট বন্ধের সঙ্গে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বাস্তবায়ন করতে হবে।

৫. কন্যাশিশু নির্যাতনকারীদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৬. শিশু সুরক্ষায় শিশুদের জন্য একটি পৃথক অধিদফতর গঠন করতে হবে।

৭. বাল্যবিবাহ রোধে সোশ্যাল সেফটিনেট-এর বাজেট বৃদ্ধি করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কন্যাশিশু ও তাদের অভিভাবকদের তার আওতায় আনতে হবে।

৮. বাল্যবিবাহ বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা কার্যক্রম বৃদ্ধি করতে হবে।

৯. ক্রমবর্ধমান কন্যাশিশু ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে নারী-পুরুষ, সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া, পরিবার—সবার ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

১০. কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি সব ধরনের  সহিংসতা রোধে তরুণ-যুবসমাজকে সচেতনকরণ সাপেক্ষে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যুক্ত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন একশন এইড বাংলাদেশ এর চাইল্ড স্পন্সরশিপ ম্যানেজার মনিকা বিশ্বাস, এডুকো বাংলাদেশ এর ডিরেক্টর অব প্রোগ্রাম ফারজানা খান।