কখনও যাত্রী বেশে দলের সবাই বাসে ওঠে, কখনও আবার পুরো বাসই ‘রিজার্ভ’ হিসেবে ভাড়া নেয়। তারপর বাসের চালক ও তার সহযোগীকে অস্ত্রের মুখে হাত-পা ও মুখ বেঁধে বাসের পেছনের সিটের ওপর ফেলে রাখে। বাসের চালকের আসনে বসে ডাকাত দলের সদস্য। তারপর সেই বাস নিয়ে ঘুরে বেড়ায় বিভিন্ন সড়কে। যে কোনও যাত্রী উঠলেই তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। কেড়ে নেওয়া হয় সঙ্গে থাকা সবকিছু। তারপর হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেলে রাখা হয় বাসের সিটের ওপর। এভাবে সন্ধ্যা থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত চলে এরকম ডাকাতি অভিযান। শেষে কোনও এক ফাঁকা জায়গায় বাসসহ সবাইকে ফেলে রেখে চলে যায় ডাকাত দলের সদস্যরা।
সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় ডজনখানেক বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। শফিকুল ইসলাম নামে টাঙ্গাইলের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের একজন চিকিৎসক সম্প্রতি ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে এরকম ডাকাতির কবলে পড়েন। পরে তিনি ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরপরই আন্তজেলা বাসে ডাকাতি করা দলের সদস্যদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযান শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
এরই ধরাবাহিকতায় রবিবার (৩০ জানুয়ারি) ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে নিয়মিত বাসে ডাকাতি করে আসছে; এমন দুটি ডাকাত দলের আট সদস্যকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিম। গ্রেফতারকৃতরা হলো- বিপ্লব, সজীব, জহির, নাঈম, দিলীপ সোহেল, আল আমিন, আজাদ ও আল আমিন (২)। তাদের কাছ থেকে বাসে ডাকাতি করার জন্য ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্রের পাশাপাশি নগদ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে।
গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার শাহাদত হোসেন সুমা বলেন, গ্রেফতারকৃতরা সবাই পেশাদার অপরাধী চক্রের সদস্য। তাদের সবার বিরুদ্ধেই একাধিক ডাকাতি, ছিনতাইসহ খুনে মামলাও রয়েছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে তারা আবার একই কাজে নিয়োজিত হয়।
গোয়েনন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃতরা পৃথক দুটি দলে ভাগ হয়ে বাসে ডাকাতি করে বেড়াতো। তবে তারা প্রত্যেকেই একে অপরকে চিনে। কখনও কখনও তারা একসঙ্গেও ডাকাতি করেছে। একটি দলের নেতা বিপ্লব ও আরেকটির দলনেতা দিলীপ সোহেল। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি সহযোগীদের গ্রেফতারেও অভিযান চালানো হচ্ছে।
বাসে ডাকতির কবলে পড়া টাঙ্গাইলের ২৫০ শয্যা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক শফিকুল ইসলাম রবিবার (৩০ জানুয়ারি) রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২০ জানুয়ারি তিনি উত্তরার আব্দুল্লাহপুর এলাকা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী একটি বাসে টাঙ্গাইলে যাওয়ার জন্য এক বন্ধুসহ উঠেছিলেন। বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পরেই যাত্রীবেশে ডাকাত দলের সদস্যরা তাদের হাত-পা ও মুখ বেঁধে সবকিছু কেড়ে নেয়। বাস নিয়ে ডাকাত দলের সদস্যরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার এটিএম বুথে গিয়ে তার সঙ্গে থাকা এটিএম কার্ড থেকে টাকাও তুলে নিয়েছিল।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, বাসে ডাকাতি চক্রের সদস্যরা বেশিরভাগ সময় রাজধানী থেকে আশেপাশের এলাকায় যাতায়াতকারী বাসগুলোকে টার্গেট করে থাকে। একটি ডাকাত দলে সাধারণত ৮-১০ জন থাকে। তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে টার্গেটকৃত বাসে ওঠে। যাত্রী বেশে বসে থেকে হঠাৎ করেই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সাধারণ যাত্রীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বাসের চালক ও সহযোগীকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বাসটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। তারপরই শুরু হয় তাদের রাতভর ডাকাতির অভিযান।
গ্রেফতারকৃত ডাকাত দলের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, বাসে ডাকাত দলের সদস্যরা কখনও কখনও দিনের বেলা কোনও এক বাস চালকের কাছ থেকে মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে বা বাস রিজার্ভ নেওয়ার জন্য কথা বলে। সন্ধ্যার পর কাঙ্ক্ষিত বাসটি নির্দিষ্ট জায়গায় এলে ডাকাত দলের সদস্যরা তাতে উঠে চালক ও সহযোগীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডাকাতি করে বেড়ায়।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু বাসে যাত্রী তুলেই ডাকাতি নয়, এই চক্রের সদস্যরা সড়কে ট্রাক আটকিয়ে মালামাল ছিনতাইসহ সড়কের আশেপাশে থাকা দোকানপাট ও বাসাবাড়িতেও ডাকাতি করে। গত ১৬ জানুয়ারি ঝিনাইদহের বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ হৃদয় টাঙ্গাইলের মির্জাপুর থানায় একটি ডাকাতি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ফয়সাল অভিযোগ করেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ফতেপুর এলাকায় বাস নিয়ে আসা একদল ডাকাত তাদের একটি পণ্যবাহী ট্রাক আটকিয়ে চালক ও সহযোগীকে বাসে তুলে নিয়ে পণ্যসহ ট্রাক নিয়ে চলে যায়। ওই ট্রাকে প্রায় অর্ধ কোটি টাকার মালামাল ছিল।
এছাড়া গত ১৮ জানুয়ারি পাভেল নামে সোনারতরী পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো- ব-১১-১৫০৫) চালক সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৪ জানুয়ারি তিনি বগুড়ার ঠনঠনিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার গাবতলী আসার পথে আশুলিয়া ও সাভার এলাকা থেকে যাত্রীবেশে ডাকাত দলের সদস্যরা তার বাসে উঠে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বাসে থাকা যাত্রীসহ তাদের কাছে থাকা সর্বস্ব লুটে নেয়। একই সঙ্গে বাসটি তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী তুলে ডাকাতি করে বেড়ায়।
গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানী ঢাকাসহ আশেপাশের এলাকায় এরকম বেশ কয়েকটি ডাকাত দলের চক্র রয়েছে। দুটি চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও কয়েকটি চক্রের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে চক্রের সদস্যরা অল্প দিনের মধ্যেই জেল থেকে জামিনে বের হয়ে এসে আগের মতো ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে।