সেই ওয়াহেদ ম্যানশনে ফের প্লাস্টিকের দোকান!

রাজধানীর পুরান ঢাকায় ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনায় ৭১ জন মানুষ প্রাণ হারান। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন। অভিযোগ ওঠে, ভবনটিতে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য আগুন তীব্র করতে সহায়তা করে। এরপর দীর্ঘদিন পুরান ঢাকার মতো এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্লাস্টিক উপকরণ বিক্রি বন্ধের দাবি ওঠে। অথচ সেই ওয়াহেদ ম্যানশনে ফের প্লাস্টিক পণ্য, প্লাস্টিক দানাসহ বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের পাশাপাশি একটি ওয়ার্কশপকে দোকান ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

মঙ্গলবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সরজমিনে দেখা গেছে, চকবাজারের চুড়িহাট্টার নন্দ কুমার দত্ত সড়কের ৬৪ নম্বর ওয়াহেদ ম্যানশনের অগ্নিকাণ্ডের দুই বছরের মাথায় পুরোপুরি সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা হয়েছে। ভবনের দ্বিতীয় তলার সড়কের পাশের ফ্লরে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। তারা দ্বিতীয় তলা ব্যবহার শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত তৃতীয় তলা সংস্কার হলেও সেটি এখনও খালি, তবে চারতলা ভাড়া হয়েছে।

ওয়াহেদ ম্যানশন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)ভবনটির নিচ তলার পশ্চিম ও উত্তর পাশে বেশ কয়েকটি দোকান ভাড়া হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে প্লাস্টিকের দানা বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়াও হক বেকারি ও নোয়াখালী স্টোর নামে একটি কনফেকশনারির দোকান ও দুটি ভ্যারাইটিজ স্টোরও চালু হয়েছে। এছাড়াও সাগর রেফ্রিজারেশন নামে আরও একটি দোকানে পুরনো এসি, ফ্রিজ মেরামতের ওয়ার্কশপ দেওয়া হয়েছে এবং একটি এটিএম বুথ রয়েছে।

ভবনটির নিচ তলার ভেতরে দুই সারি করে দুই সাটারের ১০টি দোকান করা হয়েছে। যার একটি পাটওয়ারী ফ্রুটস ও ভ্যারাইটিজ স্টোর। বাকি দোকানগুলো ভাড়া হওয়ার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে দোকানদারদের সঙ্গে আলাপকালে কেউই ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি।

ওয়াহেদ ম্যানশন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)চুড়িহাট্টার বাসিন্দা সজল নামে এক তরুণ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা কেমিক্যালের বিরুদ্ধে অনেক আন্দোলন করেছি, বাসাবাড়িতে যাতে প্লাস্টিক দানা, ফ্লেবার ক্যামিক্যালের দোকান ভাড়া না দেওয়া হয়, অনেকবার বলেছি, কিন্তু কোনও কিছুই কাজ হচ্ছে না। এক একটি অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসন অভিযানে নামে। কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এলেও কয়েকদিন পরে আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়।’

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে চকবাজার মডেল থানাধীন চুড়িহাট্টা শাহী জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় চলাচলরত একটি প্রাইভেটকারের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পাশের বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে আগুন লাগে। তৎক্ষণাৎ পাশে আরেকটি প্রাইভেটকারে আগুন লাগলে সেই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। ওই রাতে চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন মারা যায়। ওই ঘটনায় চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

ওয়াহেদ ম্যানশন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)মামলার অভিযোগে বলা হয়, ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিকের দুই ছেলে মো. হাসান ও সোহেল ওরফে শহীদ তাদের চতুর্থ তলার বসতবাড়ির বিভিন্ন ফ্লোরে দাহ্যপদার্থ ক্রয়-বিক্রয়কারীদের কাছে আর্থিকভাবে লাভবানের আশায় ভাড়া দেন।

ঘটনার তিন বছর যেতে না যেতেই ওই ভবনে একই রকম সরঞ্জাম বিক্রির জন্য ভাড়া দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা সালাম। তিনি বলেন, ‘এতোগুলো মানুষ মারা গেলো, তারপরও সেখানে প্লাস্টিকের দানার দোকান, ক্যামিক্যালের দোকান ভাড়া দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘ঘটনার পর বাড়ির মালিক, তাদের ছেলে ও ম্যানেজারকে গ্রেফতার করা হলেও তারা জামিনে বের হয়ে ভবনের সংস্কার করলো, ভবন ব্যবহারের অনুমতি পেলো, কিন্তু ভবনটি কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই খেয়াল কেউ রাখছে না।’
বুধবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় করা মামলায় ভবনের মালিক দুই ভাই মোহাম্মদ হাসান সুলতান ও হোসেন সুলতানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ।

ওয়াহেদ ম্যানশন (ছবি: সাজ্জাদ হোসেন)অভিযোগপত্রে অপর আসামিরা হলেন, রাসায়নিকের গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের কাছে ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতরসহ বেশ কয়েকটি সংস্থার প্রতিবেদন আসার পর সবকিছু বিশ্লেষণ করে আমরা অভিযোগপত্র দিয়েছি। যারা এই ঘটনার সঙ্গে দায়ী তদন্তে তাদের সম্পৃক্ততা এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘এজাহার নামীয় দুজন আসামি ছিল। বাকি ছয়জনের সম্পৃক্ততা তদন্তে পেয়েছি। তাদের অভিযোগ করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।’