‘সবার আব্বু আসবে, আমার আব্বু তো আর আসবে না! এখন আমাকে খেলনা এনে দেবে কে?’ বাবার কথা মনে হলে এভাবেই কান্নাকাটি করে মাকে প্রশ্ন করে কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যাওয়া পুলিশ কনস্টেবল মামুন মিয়ার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে রায়হান। কষ্ট চেপে রেখে মা ইতি আক্তার তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
কর্তব্যরত অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের আত্মোৎসর্গকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে পুলিশ মেমোরিয়াল ডে ২০২২ উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। মঙ্গলবার (১ মার্চ) রাজধানীর মিরপুর-১৪ নম্বরের পুলিশ স্টাফ কলেজ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহীদ পুলিশের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। বাংলা ট্রিবিউনের কাছে নিজেদের প্রিয় মানুষটির হারানোর কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকে।
খুলনার মোল্লারহাট থানায় কর্মরত কনস্টেবল মামুন মিয়া ২০২১ সালের অক্টোবর মাসের ১৫ তারিখ মারা যান করোনা আক্রান্ত হয়ে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পারিবারিক সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ইতি আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন, দেশের কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেকে আত্মোৎসর্গ করেছেন–এটাই আমার সান্ত্বনা। এই বিষয়টি আমার জন্য অনেক গর্বেরও। ছুটি শেষে আমার স্বামী যখন বাড়ি আসতেন তখন ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা হতো। ছেলে রায়হান বাড়ি আসার সময় বাবাকে ফোনে জানিয়ে দিতো আসার সময় কী আনবে। এখন পাঁচ বছরের শিশুসন্তান আমাকে বলে, “এখন তো আমার আব্বু নেই। কে আমাকে সবকিছু এনে দেবে?” আমি তাকে সান্ত্বনা দিই, “আমি কিনে দেবো তোমাকে।” এভাবেই পার করতে হবে বাকিটা জীবন।’
কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ২০২১ সালের ৭ জুলাই মারা যাওয়া খুলনা রেলওয়ে জেলার পুলিশ পরিদর্শক ফয়জুর রহমানের ছেলে নাফিস শাহরিয়ার বলে, ‘আমি বাবার মতো পুলিশ অফিসার হতে চাই। বাবা আমার কাছে হিরো। দেশের জন্য তিনি আত্মোৎসর্গ করেছেন, এটাই আমার গর্ব।’
বাবা হারানোর যন্ত্রণা কষ্ট চেপে রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র নাফিস আরও বলে, ‘আমরা দুই ভাই। আমি বড়। আমরা এখনও বাবার পুরো টাকা পাইনি। আমার মা অসুস্থ। এখানে উপস্থিত হতে পারেননি, সে জন্যই আমি এসেছি।’
করোনাকালীন কর্তব্য পালন করতে গিয়ে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ অসুস্থ হয়ে পড়লে রাজারবাগ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কনস্টেবল রবীন্দ্রনাথ রায়কে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ এপ্রিল মৃত্যু হয় তার। পুলিশ মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী সুনিতা রানী রায় বলেন, ‘যার যায় সেই বোঝে হারানোর যন্ত্রণা। আমার এক ছেলে এসআই। ৩৮তম ব্যাচে যোগ দিয়ে বর্তমানে এপিবিএনে কর্মরত রয়েছে। আমার স্বামীর ৩৯ বছর চাকরি জীবনের শেষ সময়ে কর্মরত ছিলেন সাভার ট্রাফিক বিভাগে। একটাই সান্ত্বনা, আমার স্বামী দেশের জন্য দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা করতে গিয়ে মারা গেছেন।’
পুলিশ মেমোরিয়াল ডে উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে পুলিশ প্রধান ডক্টর বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে প্রতিটি পুলিশ সদস্য জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছেন। যারা কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যাচ্ছেন, নিজেদের আত্মোৎসর্গ করছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর কোনও ভাষা নেই। তাদের পাশে পুলিশের পক্ষ থেকে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলমান রয়েছে। বিপন্ন পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। যেহেতু আমরা সবসময় যুদ্ধাবস্থার মধ্যে থাকি, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এছাড়া কোনও সদস্য অসুস্থ হলে আর্থিকভাবে সহায়তা করে থাকি।’
আইজিপি বলেন, ‘বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে জেলা পর্যায়ে পুলিশ মেমোরিয়াল ডে ২০২২ উপলক্ষে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা এবং সহায়তা করা হয়েছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে জেলায় জেলায় পুলিশ মেমোরিয়াল ডে পালন করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে অনুষ্ঠানটি পালন করা হলেও মৃত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা যেখানে রয়েছেন, সেই জেলাতে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। জানমাল রক্ষা করতে গিয়ে আমরা আমাদের সহকর্মীকে হারিয়েছি, বন্ধুদের হারিয়েছি। বাবা মেয়েকে হারিয়েছে, ছেলে বাবাকে হারিয়েছে, স্ত্রী স্বামীকে হারিয়েছে, মা ছেলেকে হারিয়েছে। এতকিছুর পরও পুলিশ সদস্যরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।’