‘আমি অসহায়, আমার প্রতি চরম অন্যায় ও জুলুম করা হয়েছে’

‘আমার প্রতি চরম অন্যায় ও জুলুম করা হয়েছে, আমি অসহায়। চাকরিবিধি অনুযায়ী, কমিশন বরাবর আমি পুনর্বহালের একটি আবেদন করেছি। আশা করি কমিশন আমার রিভিউটি একসেপ্ট করবে এবং আমি ন্যায়বিচার পাবো।’ দুদক থেকে আকস্মিক চাকরিচ্যুত উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন মঙ্গলবার (১ মার্চ) দুপুরে সেগুনবাগিচায় দুদক কার্যালয়ের সামনে এসব কথা বলেছেন। চাকরিচ্যুত হওয়ার পরও একটি বিভাগীয় মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে এসে এসব কথা বলেন তিনি।

শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী ও কমিশনের কাছে সুযোগ চাচ্ছি। আমার দেশপ্রেমের কোনও ঘাটতি নেই। আমি প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষণা করা জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নের জন্য অগ্রগামী একজন সৈনিক হতে চাই।’

সম্প্রতি দুদকের চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) ধারা প্রয়োগ করে কোনও ধরনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া ছাড়াই আকস্মিক চাকরিচ্যুত করা হয় উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে। দুর্নীতির তদন্ত করতে গিয়ে প্রভাবশালীদের চাপের মুখে তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে- এমন অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ নিয়ে মানববন্ধন করেন। পরে দুদকের পক্ষ থেকে শরীফের বিরুদ্ধে ১৩টি অভিযোগ আনা হলেও একটিরও প্রমাণ হাজির করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আমার কাছে খুব বিব্রতকর একটা পরিস্থিতি যে আমি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আজকে (১ মার্চ) দুদকে হাজিরা দিতে এসেছি। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি আমাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। আমি অপসারিত হওয়ার পরও বিভাগীয় মামলায় হাজিরা দিচ্ছি। আমার বিরুদ্ধে তিনটি ডিপি (ডিভিশনাল প্রসেডিং) চলমান, প্রথম ডিপি নো ডেবিট, দ্বিতীয়টি নথি হস্তান্তরে দেরি হওয়া নিয়ে আর তৃতীয়টি আমি দেরিতে কর্মস্থলে যোগদান করেছি কেন সে বিষয়ে। আজকে ডিডি মশিউর রহমান নথি হস্তান্তরে দেরি হওয়ার ডিপি নিয়ে ডেকেছিলেন। আমি ফিজিক্যালি এসে উনাকে যাবতীয় প্রমাণ দিয়েছি।

শরীফ জানান, গত বছরের ১৬ জুন চট্টগ্রাম থেকে তাকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। তার সঙ্গে ২০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে ৩০ জুন বিকালে অবমুক্তি নেন তিনি। এ সময় তার কাছে প্রায় ১০৫টা নথি ছিল। এগুলো একসঙ্গে হস্তান্তর করার জন্য অনেক চালান লিখতে হয়। সেদিন কিছু নথির চালান লিখেন তিনি। পরদিন অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে সরকার ঘোষিত লকডাউন শুরু হয়। এছাড়া তিনি কোভিড আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে থাকার কথাও জানান। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব বিষয় যাচাইও করেছেন। তারপর তার বিরুদ্ধে ডিপি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

শরীফ জানান, তার সঙ্গে আরও ১৯ জনের যে বদলি হয়েছিল, তারা একসঙ্গে গত বছরের ১০ আগস্ট ফিজিক্যালি যার যার কর্মস্থলে যোগদান করেন। এর আগে ই-মেইল ও ডাকযোগে যোগদানপত্র পাঠান। যোগদানের পর নতুন কর্মস্থল থেকে অবমুক্তি না পাওয়ার কারণে তিনি যথাসময়ে নথি বুঝিয়ে দিতে পারেননি।

শরীফ উদ্দীন বলেন, ‘যেটা আমাদের দুদকে একটা প্র্যাকটিস, বদলি হয়ে যাওয়ার পর ছুটি নিয়ে ধীরে ধীরে নথিগুলো হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। আমাকে সরাসরি ২২/৮/২১ তারিখে নোটিশ করা হয়েছে যে আমি কেন নথি হস্তান্তর করিনি। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, আমাকে আসতেও দেওয়া হয়নি, নথি হস্তান্তর করার সুযোগও দেওয়া হয়নি। তারপরও আমাকে ওই আদেশ মূলে ২৫ তারিখে কর্মস্থল থেকে অবমুক্তি দেওয়া হয়েছে। ২৯ তারিখের মধ্যে সব নথি বুঝিয়ে দিয়েছি। আজকে সেটার জন্যই আমাকে ডাকা হয়েছে।’

শরীফ বলেন, ‘এতদিন কর্মরত ছিলাম, হয়তো বা একটা ঝুঁকি থাকলেও ডিপার্টমেন্ট সেভ করতো, এখন তো আমি ডিপার্টমেন্টেও নেই। আমার বাসায় এসে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি লিখিতভাবে ডাইরেক্টর (প্রশাসন) স্যারের সঙ্গে আলাপ করেই জিডি করেছি। আমি লিখিতভাবেই জানিয়েছি। স্যারেরা বলেছেন, আমি জানাই নাই, আমি কিন্তু লিখিতভাবেই জানিয়েছি। অফিসিয়াল সব স্টেপ মেইনটেইন করেছি। আমার কাছে অডিও-ভিডিও সব রেকর্ড রয়েছে। আসলে স্যারদের কোনও জায়গা থেকে মিসগাইড করা হচ্ছে।’

উল্লেখ্য, এর আগে দুদকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে শরীফের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয় তার মধ্যে হুমকি পাওয়ার পর তিনি তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে না জানানোর দাবি করেন দুদক সচিব।

শরীফ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, মূলত কয়েকটা নথির তদন্ত, আপনারা জানেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স বাস্তবায়ন করতে গিয়েই আজকে আমি প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েছি। আমার হয়তো গুম হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, দুদকের কর্মী, সাংবাদিক ও মানুষের দোয়ায়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেহেতু বিষয়টা গেছে, এ কারণে আমি এখনও গুম হইনি।’

প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুতি জানিয়ে শরীফ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার মা। আপনার কাছে আকুল আবেদন জানাবো, মা আমি অসহায়, আমি আমার বাচ্চাগুলো নিয়ে অসহায় অবস্থায় আছি। আমি গত দুই সপ্তাহ ঘুমাতে পারিনি। আমাকে সুযোগ দেওয়া হোক, কমিশনের যত অভিযোগ আছে, আমাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয়, আমি প্রত্যেকটা অভিযোগ খণ্ডাতে পারবো। আমার কাছে ডকুমেন্ট রয়েছে। আমাকে সাসপেন্ড করেও এসব অনুসন্ধান করতে পারতো, কিন্তু সরাসরি রিমুভাল করে দিয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে যারা সংবাদকর্মী রয়েছেন তারা জানেন, আমি রোহিঙ্গা এনআইডি নিয়ে কাজ করেছি। আমি তো দেশের জন্য কাজ করেছি। রোহিঙ্গারা তো বিষফোঁড়া, আমি বের করেছি। আমার কাছে এখনও তথ্য রয়েছে কারা কীভাবে বাংলাদেশে সার্টিফিকেটগুলো (জন্মনিবন্ধন ও এনআইডি দেওয়া) দিয়ে এ দেশটাকে নষ্ট করছে। আমি চার জনকে অ্যারেস্টও করেছি। এই মামলার অনুসন্ধান কমিটিতে ছয় জন ছিল। আমি সর্বকনিষ্ঠ মেম্বার, অন্যদের কারও বক্তব্য নেওয়া হয়নি। ওনাদের দোষ নেই আমার একার কেন দোষ হবে?’

হাইকোর্টে রিট হওয়া প্রসঙ্গে দুদকের এই সদ্য অপসারিত কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে ১০ জন আইনজীবী রিট করেছেন। ওই রিটের সঙ্গে আমার কোনও সম্পৃক্ততা নেই। তারা কী উদ্দেশ্যে করেছে আমার জানা নেই। কমিশন তাদের দিয়ে করিয়েছে কিনা আমার সন্দেহ হচ্ছে। আমাকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে। অথচ আমার সংক্ষুব্ধ হয়ে রিট করার কথা। তাদের কাউকে আমি চিনিও না, কখনও দেখিনি। তাদের সঙ্গে কোনও কথাও হয়নি।’

‘এর আগে আমার বদলি হওয়ার সময় কেউ একজন রিট করেছিল, তার সঙ্গেও আমার কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না। এটা কমিশন অনুসন্ধান করছে। যে ব্যক্তি এটা করেছে তাকে আমি চিনি না, তিনিও আমাকে চেনেন না। আমি আইনি প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে চাকরিতে পুনর্বহালের রিভিউ আবেদন করেছি। আশা করছি কমিশন আমার কথা শুনবে। আমার রিভিউ করবে, আমাকে সময় দেবে। আমি যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি, আমি যে জুলুমের শিকার হয়েছি, কমিশন তা দেখবে’,  কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের এসব কথা বলছিলেন শরীফ উদ্দিন।

নিজের ভাইকে প্রভাব খাটিয়ে চাকরি দেওয়া প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে আমার ছোট ভাই শিহাব উদ্দিন সবুজকে আমি চাকরি দিয়েছি। সে তো আউটসোর্সিংয়ের চাকরি করে একটা ঠিকাদার কোম্পানির আন্ডারে। সেই কোম্পানি যদি সেখানে দেয়, ঠিকাদারি, চাকরি, আজকে আছে কালকে নেই, নো ওয়ার্ক নো পে’র চাকরি। আর ওই সময়ে কোম্পানির এমডি ছিলেন খায়েজ আলম মজুমদার। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, তাকে বলেছি কিনা। এছাড়া আমার শাশুড়ির কথা বলা হয়েছে, তাকে আমি গ্যাস লাইন দিয়েছি। কোথায় গ্যাস লাইন দিয়েছি তা বিচ্ছিন্ন করে না কেন? অথচ মামলা (পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে) করার পরপরই, সানোয়ারা গ্রুপের সব লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। আমি যদি অবৈধ লাইন দিয়ে থাকি তা তো বলতে হবে, অনুসন্ধান করুক। অনুসন্ধান না করেই বলা হচ্ছে, আমি ৩৭টি বাড়ির মালিক, পুরো খুলশী এলাকার সব বাড়ির মালিক। যে লোক অভিযোগ দিয়েছে তার নামও তো ভুয়া। আমাকে কমিশন ডেকে বলতে পারতো এসব অভিযোগ সঠিক কিনা। এরকম তো আমাদের অনেকের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসে। অভিযোগ তো প্রমাণ করতে হবে।’

শরীফ বলেন, ‘আমি একজন ভেটেরনারি ডাক্তার। আমি পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মৈত্রীর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। বর্তমান সরকারের আমলেই তো এই চাকরিতে ঢুকেছি। এনএসআই-ডিজিএফআই তো আমার রাজনৈতিক আদর্শ যাচাই করেছে। এখন আমার রাজনৈতিক আদর্শ নিয়েও নানা কথা বলা হচ্ছে। বরং যারা বলছে, তাদের রাজনৈতিক কোনও আদর্শ নেই। তাদের কোনও দল নেই। কারণ, তারা দুর্নীতিবাজ। দুর্নীতিবাজই তাদের পরিচয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে বাসায় এসে যখন হুমকি দেওয়া হয়, পেট্রোবাংলার কর্মকর্তা, উনি বলেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে চাকরি খেয়ে দেবেন। এক সপ্তাহের জায়গায় ১৬ দিন লেগেছে। হ্যাঁ আমার নথিতে ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে, রিপোর্টে ভুল-ভ্রান্তি থাকতে পারে। আমি তো নবীন কর্মকর্তা, কাজগুলো করেছি আমার ওপরে কি ডিডি ছিল না, ডাইরেক্টর ছিল না, তারা কি বলতে পারেনি যে শরীফ, তোমার এই কাজটা করা অন্যায় হয়েছে। তারা তো কখনও কিছু বলেনি। আমার প্রতি আসলে ইনজাস্টিস করা হচ্ছে।’

ইদ্রিস নামে একজন সিআইপিকে নির্যাতনের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সিআইপি ইদ্রিস ও অ্যাডভোকেট নুরুল হক, দুজনকে আমি ২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি একই বাসা থেকে অ্যারেস্ট করেছি। তারপর তাদের কোর্টে সাবমিট করে কোর্ট থেকে অনুমোদন নিয়ে চট্টগ্রামে নিয়ে যাই। তাদের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়েছিল। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা ইন কালপ্রিট স্বীকারোক্তি দিয়েছে যে আমিও দোষী, সেও দোষী। সেই ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের জন্য তারা অদ্যাবধি আবেদনও করেনি। তারা কোর্টে না গিয়ে এখানে (দুদক কার্যালয়) এসে বলছে যে তাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। এটার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যালে দুদক থেকে একটি চিঠি গিয়েছিল যে তাকে (সিআইপি ইদ্রিস) ফিজিক্যাল টর্চার করা হয়েছে কিনা? কিন্তু মেডিক্যাল থেকে তাকে কোনও ধরনের টর্চার হয়নি বলেছে। তারপরও সেই অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে।’

শরীফের বক্তব্যের প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে দুদক সচিব মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শরীফকে অপসারিত করার পর তার বিরুদ্ধে চলমান তিনটি বিভাগীয় মামলা স্থগিত করা হয়েছে। তারপর তাকে কারা, কেন দুদক কার্যালয়ে ডেকেছিল তা আমার জানা নেই। আর শরীফ চাকরিতে পুনর্বহালের আবেদন করেছেন। এটি নিয়ে পরে কমিশন সভায় আলোচনা হবে। আলোচনা করে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবেন। এটা নিয়ে আসলে অগ্রিম কিছু বলা যাবে না।’