বিভিন্ন সময় ভ্রমণ, ব্যবসা কিংবা অন্য কোনও ভিসায় বাংলাদেশে আসেন বিদেশি নাগরিকরা। এদের মধ্যে একটা অংশ ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ নিয়েই আসেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও থেকে যান তারা। অবৈধভাবে থাকার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন নানা ধরনের অপরাধে। আর আর্থিক মুনাফার লোভে এসব বিদেশি নাগরিকের প্রতারণায় সহায়তা করে দেশি কয়েকটি চক্র। অবৈধভাবে বসবাসকারী এসব বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে দেশীয় এই চক্রগুলোরও অনেক সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন বিভিন্ন সময়। তবে দেশে ঠিক কী পরিমাণ বিদেশি নাগরিক বসবাস করছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এ বিষয়ে বেশ বেগ পেতে হয়। এছাড়া অনেকেই বিভিন্ন সময়ে মামলা হওয়ার পর, এমনকি কারাভোগের পরও দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। কীভাবে পালিয়ে গেছে, সে বিষয়গুলো থেকে গেছে ধোঁয়াশায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশেষ করে নাইজেরিয়া, সোমালিয়াসহ আফ্রিকান কিছু দেশের নাগরিকরা স্বভাবগতভাবেই অপরাধপ্রবণ। বাংলাদেশে এসে দেশিয় চক্রের সদস্যদের সহায়তায় তারা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারা বিভিন্নভাবে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ করে নারীদের টার্গেট করে। এছাড়াও টার্গেট করে বড় বড় ব্যবসায়ী ও হাই প্রোফাইলের লোকজনদের। বিভিন্ন উন্নত দেশে বসবাস করছেন- এমন প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলে বিদেশি নাগরিকদের একটি চক্র। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উপহার সামগ্রী পাঠানোর নামে আদায় করা হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির সাথে বিদেশি চক্রের সাথে আঁতাত রয়েছে দেশি বেশ কয়েকজনের সাথে।
সম্প্রতি বিদেশি নাগরিকদের নানা ধরনের অপরাধ, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে সাইবার মনিটরিং জোরদার করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এছাড়া ভুক্তভোগী যারা আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন, তাদের বিষয়গুলো গোয়েন্দা পুলিশ কিংবা সিআইডি কিংবা র্যাব ছায়াতদন্ত করে অপরাধীদের গ্রেফতার করে আনছে। তবে বিদেশি নাগরিকদের অবস্থানের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনও পরিসংখ্যান না থাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়।
জানা গেছে, রাজধানীর পল্লবী, উত্তরা ও বাড্ডা এলাকায় আফ্রিকার নাইজেরিয়া, সোমালিয়া ও উগান্ডার নাগরিকরা বেশি বসবাস করে থাকে। তারা বাসা ভাড়ার নেওয়ার সময় নিজেদের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী কিংবা খেলাধুলার সাথে জড়িত বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। আর এরাই অনেক সময় বাংলাদেশে থেকেই বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এমনই দুই নাইজেরিয়ান নাগরিক বেন কারলোস ও রবিনসন হেনরি। রবিনসনের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় হয়েছিল এক গৃহবধূর। পরিচয়ের মাধ্যমে সখ্যতার এক পর্যায়ে বিদেশ থেকে মূল্যবান সামগ্রী পার্সেল পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন রবিনসন। এর কিছুদিনের মধ্যে ‘শাহজালাল বিমানবন্দরে চাকরি করেন’-এমন পরিচয়ে এক ব্যক্তি ওই নারীকে ফোন করে জানান, তার একটি পার্সেল এসেছে। সেটি ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য থাকে খরচ বহন করতে হবে। খরচ বহন করার জন্য বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে কার্লোস তখন সেই নারীকে এও জানান যে, স্ক্যান করে দেখা গেছে বক্সের ভেতর কিছু পাউন্ড এবং একটি সোনার চেইনসহ বেশ কিছু মূল্যবান মালামাল রয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েক দফায় বিভিন্ন ব্যাংক একাউন্টে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পাঠান ওই নারী।
এসব একাউন্ট ছিল মহসিন নামে এক ব্যক্তির। সম্প্রতি তাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সিটি ইন্টেলিজেন্স অ্যানালাইসিস বিভাগ মোবাইল মনিটরিং সেল। এসময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৬টি ব্যাংকের ডেবিট এবং ক্রেডিট কার্ড এবং বেশ কিছু চেক বই। জিজ্ঞাসাবাদে কর্মকর্তাদের কাছে মহসিন স্বীকার করে, ২ নাইজেরিয়ান নাগরিকের সঙ্গে তার পরিচয় হয় জেলে। পরবর্তী সময়ে সেখান থেকেই তাদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে। জেল থেকে বেরিয়ে বেন কারলোস ও রবিনসন হেনরির কথামতো ভুয়া তথ্য দিয়ে ব্যাংক একাউন্ট খোলেন তিনি। এসব একাউন্টে টাকা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে টাকা তুলে বিদেশি দুই নাগরিকের হাতে পৌঁছে দিতো মহসিন।
জিজ্ঞাসাবাদে মহসিন আরো জানায়, তার নামে ১৮টি ব্যাংক একাউন্ট ছিল। এভাবে বিদেশি নাগরিকদের প্রলোভনের মাধ্যমে তার একাউন্টে এক ব্যক্তি প্রায় ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত পাঠিয়েছিলেন। বিভিন্ন সময় টাকা ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে টাকা তুলে নেওয়া হতো। যাতে কেউ পরবর্তী সময়ে ক্লেইম করলেও টাকা ফ্রিজ করতে না পারে। এভাবে প্রতারণার মাধ্যমে মহসিন গেল কয়েকবছরে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন।
র্যাবের আরেকটি অভিযানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করে দামী উপহার পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ৫ জন নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের সহায়তার অভিযোগে মো. নাহিদ এবং সোনিয়া আক্তার নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে কর্মকর্তারা জানতে পারে, বড় বড় ব্যবসায়ী, হাইপ্রোফাইল চাকরিজীবীসহ উচ্চবিত্তদের টার্গেট করে থাকতো তারা। নিজেদের পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশের সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে সখ্যতা তৈরি করতো। পোশাক পরিহিত ছবি পাঠিয়ে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য প্রলুব্ধ করতো। গ্রেফতারকৃত নাগরিকদের মধ্যে অনেকের ভিসা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অবৈধভাবে বাংলাদেশে অবস্থান করছিল এবং গ্রেফতারকৃত দুই জন এর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আর বাংলাদেশের নাগরিক সোনিয়া আক্তার এবং নাহিদুল তাদেরই দেশীয় সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছিল। বিদেশি নাগরিকরা তাদের দিয়ে ভিকটিম সংগ্রহ বন্ধুত্ব স্থাপন কাস্টমার অফিসের পরিচয় এবং শেষে অর্থ সংগ্রহ করে আসছিল।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কোন বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে এসে কোনও ধরনের প্রতারণার কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার বিষয়গুলো আমরা প্রতিনিয়ত নজর রাখছি। যখনই বিদেশি প্রতারকদের সংশ্লিষ্টতায় তাদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে সেই সাথে দেশীয় প্রতারক চক্রের বিষয়টি আমাদের সামনে আসছে এবং গ্রেফতারের আওতায় নিয়ে আসছি। বিদেশি নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে পাওয়া অর্থের ভাগ বিদেশি নাগরিকদের কাছেও যায় সেই সাথে তাদের সহায়তায় কারণে দেশি যারা এ ধরনের প্রতারণামূলক ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা থাকে তাদের কাছেও যায়। বিদেশি নাগরিকরা যেখানেই বাসা ভাড়া নেয় বাড়িওয়ালারাও অপেক্ষাকৃতভাবে তাদের কাছ থেকে একটু বেশি ভাড়া পেয়ে থাকে। তবে এসব বিষয়ে আমরা নজরে রাখছি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম এন্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের সিটি ইন্টেলিজেন্স এনালাইসিস বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার আরিফুল হোসেইন তুহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারো সঙ্গে পরিচয় বিশেষ করে বিদেশি নাগরিকদের সাথে পরিচয় এবং তথ্য শেয়ার করার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তাদের দেওয়া কোনো প্রলোভনে বা লোভে পড়ে আর্থিক লেনদেন করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এরা উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গের তথ্য সংগ্রহ করে যা দেশীয় বিভিন্ন চক্রগুলো তাদের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এতে করে বিদেশিদের অপরাধের প্রবণতা আরো বাড়িয়ে তুলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির কারণে এসব বিষয় মনিটরিং দেখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
বিদেশি বন্ধুর উপহারের ফাঁদ, কাস্টমসের নামে প্রতারণা
কেন ফেরত পাঠানো যায় না বিদেশি অপরাধীদের?