আজকের ‘তারা’

আলী আসগর তারা একজন বাংলাদেশি ট্রান্সজেন্ডার নারী শিল্পী, গবেষক ও সমাজকর্মী। তিনি বর্তমানে নিউ ইয়র্কের পেস ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন। তারা বর্তমানে বাস করেন ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্কে এবং কাজ করেন লিঙ্গ ও যৌন প্রান্তিক মানুষের চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, টিকে থাকার বিষয়বস্তু নিয়ে। তারা তার কাজের মাধ্যম হিসেবে লেখা, ছবি, ভিডিও, স্থাপনাশিল্প, পারফর্মেন্স ব্যবহার করে থাকেন। যার মাধ্যমে তিনি তার নিজের জীবন অভিজ্ঞতা উপস্থাপন করেন এবং একটি সামাজিক আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেন।

তারার কাজে প্রতিফলিত হয়, লিঙ্গ প্রান্তিক মানুষ হিসেবে বাংলাদেশি সমাজ বাবস্থায় তার নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা, যার মাধ্যমে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেন লিঙ্গ/যৌন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি সমাজের সংকীর্ণ দৃষ্টিকোনকে। নারী দিবসকে সামনে রেখে কথা হয় তারার সঙ্গে। তার জীবন, ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে এই সমাজের বোঝাপড়া, করণীয়—এ সব নিয়ে। নারী দিবস কেবল নারী বা পুরুষকে ঘিরে আলোচনা করবে নাকি সব লৈঙ্গিক বৈচিত্র্য নিয়ে কথা বলার দরকার আছে-এসব নিয়ে কথা বলেন তারা। 

তারা শিল্পকলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এবং পরে উচ্চতর শিল্পশিক্ষা ডিগ্রি অর্জন করেছেন আমেরিকায়, স্কুল অব দ্য আর্ট ইনস্টিটিউট অব সিকাগো হতে। ২০০৮-২০১৬ সাল পর্যন্ত ক্যুয়ের শিল্পী পরিচয়ে তারা তার শিল্পকলা প্রদর্শনী করেছেন বাংলাদেশে, জাতীয় চিত্রশালায়; শিল্পকলা একাডেমির নবীন এবং জাতীয় শিল্প প্রদর্শনীতে, ২০১৪ ও ২০১৬ সালে ঢাকা আর্ট সামিটে, বেঙ্গল ফউন্ডেশনে, জার্মান সংস্কৃতি কেন্দ্র গোথে ইনস্টিটিউটে; ব্রিটিশ কাউনসিল, ঢাকা আর্ট সেন্টার, বৃত্ত আর্ট ট্রাস্টসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রদর্শনী শালায়।

২০১৬ সালে আমেরিকায় অভিবাসনের পর থেকে মেইন, সিকাগো, নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, পিটসবার্গ, ফিলাডেলফিয়া, টরেন্টো, সান ফ্রানসিস্কসহ বিভিন্ন শহরে প্রদর্শনী, পারফর্মেন্স এবং বক্তব্য রেখেছেন বাংলাদেশের তারা। তার উপস্থিতি এবং তার এই জীবন সংগ্রাম আরও অনেক ট্রান্সজেন্ডার নর-নারীকে উদ্বুদ্ধ করবে নিশ্চিতভাবেই জীবন সুন্দর এবং সেটিকে নিজের মতো করে সাজানোর পথ সহজ না হলেও এই বোধ তৈরি হতে শেখাবে।

কীভাবে নিজের আইডেনটিটিকে আবিষ্কার করলেন?

‘ছোট থেকে আমি নেলপলিশ দিতে পছন্দ করতাম। সেটা মাও পছন্দ করতেন। কিন্তু বাবা এটা পছন্দ করতেন না। বাবা জোর করে আমার ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা করতেন। আমি বুঝতাম না, আমার আসলে আচরণটা- রোলটা কেমন হওয়ার কথা। আমি সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করতে থাকলাম। আমি সুপরিচিত স্কুলে পড়ছি ঠিকই; ছেলেদের স্কুল, কিন্তু সেখানেও কারও সঙ্গে মেলাতে পারতাম না। কিন্তু কেন পারতাম না সেটাও বুঝতে পারতাম না। স্পোর্টস পিরিয়ডে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকতাম চুপচাপ। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম আমার জেন্ডার অভিজ্ঞতা অন্য বন্ধুদের মতো না। তারা যেভাবে নিজেদের আবিষ্কার করছে আমি সেভাবে করছি না। আর সে কারণেই আমি ছেলেদের স্কুলে পড়া ১৪ বছরের কিশোর আমার ক্লাসমেটের প্রেমে পড়ি।’

যখন নিজেকে বুঝতে পারছেন সেই সময়টা কী কী ঘটছিল?

‘সমকামী নারী বা পুরুষ, ট্রান্সজেন্ডার বা ক্যুয়ের এ সব তো তখন জানার সুযোগ হয়নি। নারীদের সঙ্গে থাকি, নারীর মতো করে ভালো লাগা তৈরি হয়। মুখে মারছে না, গায়ে মারছে না, কিন্তু মনে মারছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কমিউনিটি নিয়ে লিখতে শুরু করলাম। সে সময় ঋতুর সিনেমা মারাত্মক নাড়া দিল। আমি যেন আমার ভাষা খুঁজে পেলাম। এর আগ পর্যন্ত মেয়েদের মতো হওয়া মানে হাস্যকর, খারাপ কথা শুনতে হবে। আমি পুরুষ হিসেবে পরিচিত হতে একদম পছন্দ করি না। কাস্টমার সার্ভিসে কল দিলে তারা যখন আমাকে ম্যাম বলে সম্বোধন করে আমার ভালো লাগে।’

আপনি পড়ানোর কাজ করছেন। ক্লাসরুমের পরিবেশ কেমন থাকে?

‘আমার জেন্ডার তাদের কাছে জরুরি না। তারা আমার কাছে ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি পড়তে আসে। আমার জেন্ডার আইডেনটিটি তাদের কোনও অস্বস্তির কারণ কেন হবে?’

বাংলাদেশে নানা সেক্টরে কীভাবে দৃশ্যমানতা বাড়বে?

‘এত বছরের না জানা, এটা থেকে বেরিয়ে আসা সহজ না। কিন্তু ২০২২ সালে এসে নানা জায়গায় দাপটের সঙ্গে দাঁড়াতে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ট্রান্স আইডেনটিটি কী সেটার সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে। আমেরিকায় বসে আমি যা বলছি, বাংলাদেশের ট্রান্স সেটা সহজে বলতে পারবে, এটা ভেবে নেওয়া ঠিক না। জেন্ডার যে ব্যক্তির নিজস্ব চিন্তার বিষয়, এটা কেউ বুঝতেই চায় না। ফলে দৃশ্যমানতা আর এই বোঝাপড়াগুলো পাশাপাশি চলতে থাকলে কাজ অনেকটা এগোবে। বাংলাদেশে এখন দেখার চোখ বদলেছে। এটা শুরু। যদি ভেবে নিই ‘হয়ে গেছে’ তাহলে সমস্যা।’