মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত হবে না

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব এবং এর বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের ওপরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত হবে না। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক অনেক ব্যাপক। উভয়েরই সক্ষমতা আছে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।

মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) বিকালে ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন এবং সিএফআইএসএস আয়োজিত ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক’-এর বিষয়ে এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা ট্রিবিউনের এডিটর ইন চিফ জাফর সোবহান এবং  সিএফআইএসএস-এর চেয়ারম্যান কমোডর মোহাম্মাদ নুরুল আবসারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখে—সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মোবিন চৌধুরী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব আনাম খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলাফুর রহমান এবং মার্কিন দূতাবাসের পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের কাউন্সিলর শন ম্যাকিনটস।

র‌্যাব ও র‌্যাবের কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শন ম্যাকিনটস বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হচ্ছে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। মানবাধিকারের বিষয়ে পরিষ্কার মার্কিন বার্তা দেওয়া এবং দায়বদ্ধতা উৎসাহিত করার জন্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আমরা মনে করি না যে নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে আমাদের সম্পর্কের সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে।’

মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা আমাদের সম্পর্কের যে বিভিন্ন দিক আছে, সেটি এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম এবং সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’

শন ম্যাকিনটস বলেন, ‘প্রতিটি সম্পর্কে কিছু বিষয়ে মতৈক্য হবে এবং কিছু বিষয়ে মতানৈক্য হবে। যখন মতানৈক্য হয়, তখন উভয় পক্ষের কাজ করার সুযোগ বেড়ে যায়।’

বাংলাদেশকে ‘গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলনে’ আমন্ত্রণ না জানানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। আমন্ত্রণ না জানানোর কারণ হিসেবে বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলছে। তবে আমি কারণ নিয়ে কোনও কথা বলতে চাই না। আমি যেটি বলতে চাই, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতির যে উন্নতি হয়েছে, সেটি যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য সমমনা অংশীদারদের সামনে প্রদর্শনের সুযোগ আছে বাংলাদেশের।’

সামনে দ্বিতীয় ‘গণতন্ত্র শীর্ষ সম্মেলন’ হবে। তখন দেখা যাবে— বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিনা। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধ নিয়ে কাজ করার বড় সুযোগ আছে বলে তিনি জানান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহাব আনাম খান বলেন, ‘বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নির্ধারিত হবে না।’

তিনি বলেন, ‘এটি দুঃখজনক ঘটনা। আমি মনে করি, উভয় দেশের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে এখন আলোচনা করা দরকার। প্রতিটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক ধরনের সংস্কারের মধ্য দিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে হয়তো নিষেধাজ্ঞার বদলে নীতি সহায়তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলে ভালো হয়।’

শাহাব আনাম খান বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উন্নতি অত্যন্ত জরুরি এবং এজন্য দুই সরকারের মধ্যে আলোচনার পাশাপাশি সুশীল সমাজের মধ্যে আলোচনা দরকার।’

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মোবিন চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশকে একটি দায়িত্বশীল আঞ্চলিক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা অবশ্যই দরকার। বাংলাদেশের সীমিত সম্পদ নিয়ে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আমরা মানবতা দেখিয়েছি।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বলেছিলেন—পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে রয়েছে শোষক এবং অপরদিকে শোষিত। আমরা শোষিতের পক্ষে।

শমসের মোবিন বলেন, ‘১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ উত্তর ভিয়েতনাম সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে অখুশি করেনি। কারণ, আমাদের অবস্থান তাদের আমরা ব্যাখ্যা করেছিলাম।’

ঢাকা ট্রিবিউনের এডিটর ইন চিফ জাফর সোবহান বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং কোনও দলে যোগ না দেওয়া, সবচেয়ে ভালো নীতি।’

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওই দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।’