২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরসহ আশেপাশের এলাকায় নাশকতার ঘটনায় অর্ধশতাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছিল। প্রায় ৯ বছর হতে চলছে, কিন্তু এসব মামলার বেশিরভাগেরই তদন্ত এখনও থমকে আছে। শুধু হেফাজত ইসলামের ওই ঘটনাতেই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া বেশির ভাগ রাজনৈতিক মামলার তদন্তই থমকে আছে। এমনকি বছরের পর বছর ধরে আটকে আছে শতাধিক অরাজনৈতিক মামলারও তদন্ত। এই অবস্থায় জট কমাতে দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা অরাজনৈতিক মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শফিকুল ইসলাম। তবে এরপরও রাজনৈতিক মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েই যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ মামলার আপডেট ও অপরাধ পর্যালোচনা সংক্রান্ত এক সভায় দুই বছরের অধিক সময় ধরে তদন্ত ঝুলে থাকা মামলাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সভয় ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম সভাপতিত্ব করেন। সভায় ডিএমপির ক্রাইম বিভাগ থেকে জানানো হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত রাজধানীর আটটি ক্রাইম বিভাগ ও গোয়েন্দা পুলিশের কাছে দুই বছরের অধিক সময় ধরে মোট ২১২টি মামলার তদন্ত মুলতবি (মামলা চলমান) অবস্থায় আছে। এর মধ্যে ৯৬টি মামলা রাজনৈতিক ও বাকি ১১৬টি অরাজনৈতিক।
ডিএমপি সূত্র জানায়, দুই বছরের অধিক সময় ধরে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর মধ্যে ডিএমপির রমনা বিভাগে ৫৪টি, লালবাগ বিভাগে ১টি, ওয়ারি বিভাগে ৩টি, মতিঝিল বিভাগে ৩০টি, তেজগাঁও বিভাগে সাতটি, মিরপুর বিভাগে তিনটি, গুলশান বিভাগে ৩২টি মামলা মুলতবি রয়েছে। এছাড়া ডিবি রমনা বিভাগে ১৯টি, ডিবি লালবাগ বিভাগে ১২টি, ডিবি ওয়ারি বিভাগে দুটি, ডিবি মতিঝিল বিভাগে ২০টি, ডিবি তেজগাঁও বিভাগে দুটি, ডিবি মিরপুর বিভাগে তিনটি, ডিবি গুলশান বিভাগে ১৬টি, ডিবি উত্তরা বিভাগে ছয়টি এবং উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগে দুটি মামলার তদন্ত মুলতবি অবস্থায় রয়েছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (গোয়েন্দা উত্তর) যুগ্ম কমিশনার হারুণ অর রশিদ বলেন, ‘অনেক কারণেই রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত সম্পন্ন করতে সময় বেশি লাগতে পারে। কারণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটন বা তদন্ত সম্পন্ন করতে যেসব তথ্যেও প্রয়োজন সেগুলো সংগ্রহ করতে সময় লাগে। অনেক সময় আসামিরা পলাতক থাকার কারণে তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতেও সময় লাগতে পারে। তবে আমরা সকল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা বা তদারক কর্মকর্তাদের বলেছি। আমরা মামলার তদন্ত জট কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
ডিএমপি সূত্র বলছে, মামলার তদন্ত জট কমিয়ে আনতে কমিশনার দুই বছরের অধিক পুরনো মামলাগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে রাজনৈতিক মামলা ছাড়া অন্য মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য কোনোভাবেই দুই বছরের অধিক সময় না নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীর ৫০টি থানায় মোট ২ হাজার ৫৪৮টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ২ হাজার ৮০২টি মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। রুজুকৃত মামলার চেয়ে মামলার নিষ্পত্তি সংখ্যা বাড়ানোর তাগাদা দিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের গাইড লাইন অনুযায়ী প্রত্যেক এসআই ছয়টি করে মামলা নিষ্পত্তি করবে। কোনোভাবে রুজুকৃত মামলার চেয়ে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা কম হওয়া যাবে না। এতে মামলা জট বেড়ে যাবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সাধারণ মামলার ক্ষেত্রে অনেক সময় ক্লু না পাওয়ার কারণে কিছু কিছু মামলার তদন্তে সময় প্রয়োজন হতে পারে। তবে বর্তমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও নানা সোর্স ব্যবহার করে বেশিরভাগ মামলারই রহস্য উদ্ঘাটন করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয় কারণ, এসব মামলার ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগে। অনেক সময় বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চাপে রাখতে মামলার তদন্ত পেন্ডিং রাখা হয়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার সাজ্জাদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে দুই বছরের অধিক সময় ধরে যেসব মামলার তদন্ত পেন্ডিং অবস্থায় রয়েছে, সেসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে কাজ করছি। এজন্য সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে।’