প্রায় ১০ দিন ধরে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে আকাশ পথে কৃষিপণ্য রফতানি বন্ধ রয়েছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রফতানি কার্গো কমপ্লেক্সের স্ক্যানার মেশিন বিকল হওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। এর আগেও কয়েকবার স্ক্যানার নষ্ট হওয়ায় রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গাফিলতিতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি, ইউরোপের বাজার হারানোর ঝুঁকিতে আছেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন স্ক্যানার (ইডিএস) গত এক বছরে বেশ কয়েকবার বিকল হয়েছে। প্রতিবারই বিকল হলে ঠিক হতে ১৫-২০ দিনের বেশি সময় লেগে যায়। কখনও কখনও এক মাসও পার হয়। আর এতে লোকসান গোনেন ব্যবসায়ীরা। বারবার স্ক্যানার নষ্ট হওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ তারা।
গত সেপ্টেম্বরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তিনিও সরেজমিনে সেখানকার অব্যবস্থাপনা দেখে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্ক্যানিংয়ের জন্য বেসামারিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) যে চার্জ নেয় তাতে অনায়াসে নতুন করে স্ক্যানার মেশিন কেনা সম্ভব।
দেশে কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ বলেন, ‘বিমানবন্দরে এককেজি পণ্য স্ক্যানিং করতে ৬ সেন্ট ফি দিতে হয়। আর প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ টন পণ্য রফতানি হয়। ফলে এক সপ্তাহে যে ফি আদায় হয়, তাতে এ রকম চারটা স্ক্যানার কেনা যায়। কিন্তু বেবিচকের কোনও উদ্যোগই দেখছি না।’
জানা গেছে, ইউরোপের দেশগুলোতে সরাসরি আকাশ পথে কার্গো পণ্য রফতানি করতে মানতে হবে ইউকে এভিয়েশন রেগুলেশন। তাদের অন্যতম শর্ত বিমানবন্দর থেকে শতভাগ পণ্য স্ক্যানিং করে পাঠানো। বিমানবন্দর, স্ক্যানিং মেশিন, স্ক্যানিং মেশিন পরিচালনাকারী, ব্যবহার পদ্ধতি—সামগ্রিক বিষয় হতে হবে ইউকে এভিয়েশন রেগুলেশনের মানদণ্ডে। এ জন্য ইউরোপ ছাড়া অন্য দেশের বিমানাবন্দর ও এয়ারলাইনকে নিরাপত্তা বিষয়ে অডিট শেষে সনদ দেয় ইউকে। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট (ডিএফটি) এর নিরাপত্তা ছাড়পত্র পেলেই কার্গোতে পণ্য পরিবহনের সুযোগ মেলে।
কেন ইউরোপে কৃষিপণ্য রফতানির বাজার হারাবে বাংলাদেশ?
উত্তম কুমার দেশের কৃষিপণ্য রফতানিকারকদের মধ্যে অন্যতম একজন ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘১০ দিন হয়েছে, ঢাকায় বিমানবন্দরের স্ক্যানিং মেশিন নষ্ট। ফলে এই ১০ দিনে আমরা কোনও সবজি পাঠাতে পারিনি। আমরা যদি পাঠাতে না পারি, ক্রেতারা তো আমাদের জন্য বসে থাকবেন না। তারা অন্য কোনও দেশ থেকে আমদানি করবেন। আর স্ক্যানার নষ্ট হওয়ায় পণ্য পাঠাতে পারছি না—এটা তো নতুন ঘটনা নয়। গত ছয় মাসে ৩ বার স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হয়েছে। ক্রেতারা বিরক্ত হয়ে অন্য দেশের সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছেন।’
বাংলাদেশ ফ্রুটস, ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রোডাক্ট এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সাধারণ সম্পাদক মনসুর আহমেদ বলেন, ‘কৃষিপণ্য তো রফতানি না হলে আমরা গুদামে রেখে দিতে পারবো না। এটা পচনশীল, তাই সময় মতো পাঠাতে না পেরে ব্যবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আর ইউরোপের মানুষজন কি আমাদের স্ক্যানার মেশিন ঠিক হওয়ার জন্য না খেয়ে বসে থাকবে? আমরা পাঠাতে পারছি না; এখন ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার পণ্য ঢুকবে। এভাবে থেমে থেমে তো পচনশীল খাদ্যপণ্য ক্রেতা নিতে চাইবে না। এগুলো করতে করতে আমাদের পানের মার্কেটটা ইউকেতে নষ্টই হয়ে গেলো।’
বাংলাদেশ ফুড ভেজিটেবলস অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্ট এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফভিএপিইএ) সভাপতি এস এম এ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে পণ্য পাঠাতে হলে তাদের অনুমোদিত নিরাপত্তা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি স্ক্যানার ছিল। একটা স্থায়ীভাবে নষ্ট। আরেকটা কয়েকদিন পরপর নষ্ট হয়। একেকবার নষ্ট হলে ১৫ থেকে ২০ দিন রফতানি বন্ধ থাকে। এখন কাতার হয়ে কিছু পণ্য পাঠানো হচ্ছে। ঢাকা থেকে কাতারে নিয়ে সেখানে সেগুলো যুক্তরাজ্য অনুমোদিত স্ক্যানারে স্ক্যানিংয়ের পর যুক্তরাজ্যে যাবে। কিন্তু এতে ভাড়া অনেক বেশি। আবার কাতার এয়ার সর্বোচ্চ দুই টন পণ্য নিতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এভাবে টিকে থাকা অবাস্তব।’
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কৃষিপণ্যের বড় বাজার উল্লেখ্য করে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর ধরে এমন পরিস্থিতি হচ্ছে বারবার। বেবিচককে বারবার চিঠি দিয়েও সুফল আসেনি। এতে মূলত দেশেরই ক্ষতি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের বাজারে অন্য দেশগুলো দখল করলে সেই বাজার আর ফেরত আনা যাবে না।’
ইউরোপের আকাশপথে সরাসরি পণ্য পাঠাতে গেলে নিরাপত্তার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দর ও এয়ারলাইনকে ডিএফটি’র ‘এয়ার কার্গো’ অথবা ‘মেইল ক্যারিয়ার অপারেটিং ইনটু দ্য ইউনিয়ন ফ্রম অ্যা থ্রার্ড কান্ট্রি এয়ারপোর্ট (এসিসি-৩)’ এবং ‘রেগুলেশন এজেন্ট (আরএ-৩)’ সনদ নিতে হয়। আবার নির্ধারিত সময় পরপর অডিট করে ডিএফটি।
এর আগে নিরাপত্তার অজুহাতে ২০১৬ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশের সঙ্গে আকাশপথে সরাসরি কার্গো পরিবহনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যুক্তরাজ্য। পরে দেশটির পরামর্শে নিরাপত্তা পরামর্শক নিয়োগ করে বিমানবন্দরের কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপত্তা যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই বছর পর ২০১৮ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে সরাসরি আকাশপথে পণ্য পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের করে যুক্তরাজ্য। সে সময় যুক্তরাজ্যের দেখাদেখি ইউরোপের অন্যান্য দেশও বাংলাদেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
একটি এয়ারলাইনের কর্মকর্তা বলেন, এভাবে বারাবার রফতানি কার্গো কমপ্লেক্সের স্ক্যানার মেশিন দিনের পর দিন বিকল থাকলে বিমানবন্দরের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এসব বিষয়গুলো তো ডিএফটি আমলে নেয়। ফলে তারা নিরাপত্তার বিষয়ে অসন্তুষ্ঠ হয়ে পুনরায় কোনও নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়বে।
সূত্র জানায়, দেশের সব বিমানবন্দরের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা ও সরবরাহ করে বেবিবচকের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড স্টোর ইউনিট (সেমসু)। বেবিচকের বিভিন্ন দফতরের চাহিদার ভিত্তিতে সেমসু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনে। একইসঙ্গে কোনও যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে সেই যন্ত্রাংশ মেরামত কিংবা নতুন করে সংযোজনের প্রয়োজন হলেও সেমসু’র মাধ্যমেই করতে হয়। ফলে কোনও যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে সেমসু ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠি চালাচালিতে সময় চলে যায়। একই সঙ্গে গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত গতিতে সেমসুর উদ্যোগ না থাকলে বিপত্তিতে পড়তে হয় সংশ্লিষ্টদের।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রফতানি কার্গো কমপ্লেক্সের একটি স্ক্যানার মেশিন নষ্ট হওয়ায় যুক্তরাজ্যে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে অন্যান্য দেশে পণ্য পাঠানো স্বাভাবিক রয়েছে। স্ক্যানার মেশিনটি মেরামতের জন্য যন্ত্রাংশ প্রয়োজন, সেটি এলে ফের সচল হবে।’
যন্ত্রাংশ আমদানি করে এনে স্ক্যানার মেরামত করতে দুই সপ্তাহের মতো লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন তৌহিদ-উল আহসান।