‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই আমরা মর্যাদা পেয়েছি। এই দেশের জন্মের যুদ্ধে অনেকেই সম্মুখ সারিতে থেকে যুদ্ধ করেছেন। তবে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ না করলেও অনেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, আশ্রয় দেওয়াসহ নানাভাবে সহায়তা করেছেন; আর তারাও মুক্তিযোদ্ধা।’
বুধবার (৩০ মার্চ) সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জয় বাংলা’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ শিরোনামে ৫০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গবেষকের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশ করেছে বাংলা ট্রিবিউন। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুদ্দিন আহমেদ, বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ, সম্পাদক জুলফিকার রাসেল, নগদ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক। অনুষ্ঠানে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গবেষকদের উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হয় এবং ক্রেস্ট দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমরা যারা যুদ্ধ করেছি মাঠে, তারা ছাড়াও.... যে মা নিজের খাবারটা আমাকে দিয়ে দিয়েছেন, অথবা যে বাবা আশ্রয় দিয়েছেন, নিজে গোয়াল ঘরে থেকেছেন, অথচ আমার জন্য বিছানা দিয়েছেন। তিনি কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে কম নন। আমি মনে করি, আলবদর-রাজাকার ছাড়া, এই দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠী মিলেই যুদ্ধ করেছিল। এ কারণে বাংলাদেশ যে সময়ের মধ্যে স্বাধীন হয়েছে, এটা দুনিয়াও চিন্তা করতে পারেনি।’
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ হয়েছে বলেই আমরা মর্যাদা পেয়েছি, বাংলাদেশের সঙ্গেই আমাদের অস্তিত্ব। বাংলাদেশ যখন জন্ম নেয় তখন এই দেশকে তলা বিহীন ঝুড়ি বলেছিল কুখ্যাত কিসিঞ্জার (হেনরি কিসিঞ্জার)। আমি বিশ্বাস করি— সেই কিসিঞ্জার বাংলাদেশের বর্তমান রূপ যদি দেখতো ,তাহলে তার মনে হতো, তার দুই গালে দুটো জুতার বাড়ি দিয়ে প্রতিদান দিয়েছে বাংলাদেশ।‘
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখনও অনেক বিতর্কিত কথা বলা হয় উল্লেখ করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘স্বাধীনতার ঘোষণা থেকে শুরু করে বহু বিষয় নিয়ে বির্তক তৈরি করার চেষ্টা করা হয়। আমরা ৭১-এ যুদ্ধ করেছি, কিন্তু যুদ্ধটা ৭১ এ শুরু হয়নি। বাঙ্গালির জাতিসত্ত্বার ভিত্তি হচ্ছে ভাষা, এই ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। সবাই জানেন— আমাদের জাতির পিতা বাংলা কেন্দ্রিক যে আন্দোলন করেছিলেন, সেটাই ধাপে ধাপে বাংলাদেশে রূপান্তর করেছে।’
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধে ছিলাম সংগঠকের ভূমিকায়। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সংগঠিত করেছি। যুদ্ধে আমি দেখেছি, কী উদ্যমতায় সাহস নিয়ে তারা যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সবাইকে নতুন জীবন দিয়েছে।’
মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও রাজাকারদের তালিকা করার দাবি জানিয়েছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ছিলাম, পরবর্তী সময়ে মুজিব বাহিনী গঠিত হলে সেখানে সমন্বয়ক হিসেবে ছিলাম। আমি একটা দাবি তুলবো, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও রাজাকারদের তালিকা করুন।’
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধের সময় সর্বসাকল্যে ১ কোটি মানুষ ভারতে যেতে পেরেছিলেন। বাকি ৫ কোটি মানুষ বাংলাদেশেই ছিলেন। যুদ্ধের সময় তারাই আমাদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) আশ্রয় দিয়েছেন, খাবার দিয়েছেন। তারাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, সাহস দিয়েছেন। মুষ্টিমেয় রাজাকার-আলবদর ছাড়া আর কেউ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেননি।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছারছিনার পীর শাহ মো. মহিবুল্লাহ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন উল্লেখ করে তাকে দেওয়া দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননা 'স্বাধীনতা পদক' প্রত্যাহারের দাবি জানান জেড আই খান পান্না। পদক প্রত্যাহার করা না হলে এ বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সাংবাদিক নাসিমুন আরা মিনু বলেন, ‘আমি স্মরণ করতে চাই আমাদের মায়েদের কথা। যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তারা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, খেতে দিয়েছেন। হয়তো মধ্যরাতে ১৫-২০ মুক্তিযোদ্ধারা উপস্থিত হয়েছেন, তাদের জন্য ওই অবস্থায় যা ছিল ঘরে, রান্না করে খাইয়েছেন। এরকম অনেকের কথা রাজাকাররা জেনে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। এমন অনেক ঘটনা আছে , তাদের নামও আমরা জানি না। তারা কি মুক্তিযোদ্ধ নয়? আমি তাদের শ্রদ্ধা জানাই।’
সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থটির প্রকাশনার বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করার সুযোগ পাইনি। জাতির পিতার নেতৃত্বে যারা যুদ্ধ করেছেন, জীবন দিয়েছেন তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে ইতিহাসকে জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। এই বোধ থেকেই বাংলাদেশের ৫০ বছরে এই সংকলন নিয়ে আয়োজন করা। এটি আমাদের ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। শত শত মানুষ যদি এভাবে চেষ্টা করি, তাহলে পরিবর্তী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত হবে।’
অনুষ্ঠানে বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘আমরা গ্রন্থটির নাম রেখেছি জয় বাংলা। এটি আমজনতার স্লোগান। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধাপরাধী ও রাজাকার ছাড়া সারা দেশের মানুষ জয় বাংলা স্লোগান দিয়েছেন। বহু মানুষকে শুধু এই স্লোগান দেওয়ায় পাকিস্তানি সেনারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। স্লোগানটির ভেতরে রয়েছে বাঙালির মূল চেতনা ও শক্তি।’
বাংলা ট্রিবিউনের এই উদ্যোগে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মোবাইল ফোনভিত্তিক ডিজিটাল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান নগদ। তারা ‘জয় বাংলা’ গ্রন্থটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছে। অনুষ্ঠানে নগদ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর এ মিশুক বলেন, ‘বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনের প্রস্তাব যখন আমার কাছে আসে, আমি ইমোশনাল হয়ে পড়ি। বইটির প্রতিটি পাতা উলটে মুক্তিযুদ্ধ দেখতে পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীন দেশ দিয়েছে, আমরা জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা পেয়েছি।’
ছবি: নাসিরুল ইসলাম ও সাজ্জাদ হোসেন