শেষ হলো ১৪২৮। সন্ধ্যার সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে চলা। আগামীকাল পহেলা বৈশাখ, বছরের প্রথম দিন। বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যুক্ত হবে নতুন বাংলা বর্ষ ১৪২৯।
বুধবার (১৩ এপ্রিল) বাংলার চিরায়ত উৎসব চৈত্র সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বছরকে বিদায় জানিয়েছেন বাংলার মানুষ। জীর্ণ পুরাতন যাকিছু তা ভেসে যাক, ‘মুছে যাক গ্লানি’ এভাবে বিদায়ী সূর্যের কাছে প্রতিবছরের শেষে আহ্বান জানায় বাঙালি। বিগত বছরের গ্লানি, দুঃখ-বেদনা, যা কিছু অসুন্দর ও অশুভ সবকিছুকে ভুলে গিয়ে নতুন প্রত্যয়ে আবারও এগিয়ে চলা– এবারের নববর্ষেও সেই অঙ্গীকারকেই ধারণ করবে বাঙালি।
পহেলা বৈশাখে দুবছর পর বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। করোনা মহামারির কারণে গত দুবছর চিরাচরিত আনন্দ উৎসব করা হয়নি। দুবছর পর এবার ভোরের প্রথম আলো রাঙিয়ে দেবে নতুন স্বপ্ন, প্রত্যাশা আর সম্ভাবনাকে। রাজধানী এবং দেশজুড়ে থাকবে বর্ষবরণের নানা আয়োজন। ‘বাংলা নববর্ষ ১৪২৯’ জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে সরকারি বেসরকারিভাবে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ছায়ানট বরাবরের মতো রমনা বটমূলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কো এ শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দেয়।
বাংলা বছরের এই শেষ দিনটিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুণ্য দিন বলে মনে করেন। বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা স্নান, দান, ব্রত ও উপবাসের মধ্য দিয়ে অন্যরকমভাবে পালন করেন। আর বাঙালি গ্রামীণ সমাজে নানাধরনের শাক দিয়ে খাওয়ার চল রয়েছে। দিনটিতে বিদায়ের উৎসব পালন করেন ব্যবসায়ীরা। আগের পুরনো সব জঞ্জাল পরিষ্কার করেন। পুরনো সব হিসাব চুকিয়ে নতুন হালখাতা খোলার প্রস্তুতি এখনও চলে। রাজধানীর তাঁতিবাজার, শাঁখারী বাজার, লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার বা চকবাজারের মতো এলাকায় বছরের শেষ দিন ছিল নানা আয়োজন। ধুপগন্ধে সুরভিত ছিল চারদিক। নতুন রঙ-ঢঙয়ে যার যার মতো দোকান সাজানো হয়েছে। তবে পার্বত্য জেলাগুলোয় কয়েকদিন আগে থেকেই শুরু হয়েছে প্রস্তুতি, নানা আয়োজন।
পয়লা বৈশাখ আমাদের সকল সঙ্কীর্ণতা, কুপমণ্ডুকতা পরিহার করে উদারনৈতিক জীবন-ব্যবস্থা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বাঙালিয়ানা নতুন করে প্রাণ পায়, উজ্জীবিত হয়। অন্যদিকে পহেলা বৈশাখ বাঙালির একটি সার্বজনীন লোকউৎসব। এদিন আনন্দঘন পরিবেশে বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে গত দুইবছর পহেলা বৈশাখে নানা নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। সারাদেশে ১৪ এপ্রিল থেকে সাতদিনের জন্য লকডাউন ঘোষণা ছিল। ফলে ছিল না চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে কোনও আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু এবার করোনা মোকাবিলা করে মানুষ নতুন উদ্যমে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিয়েছে। রমজান মাসের কারণে বেলা ২টার মধ্যে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া আছে। তবে বাসায় পারিবারিক আবহে মিলনমেলা চলবে।
নববর্ষ বরণের যত আয়োজন
বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দেশের সকল জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নে বৈশাখী র্যালি আয়োজন করা হবে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) কর্তৃক বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে নববর্ষ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। সকল সরকারি-বেসরকারি টিভি, বাংলাদেশ বেতার, এফএম ও কমিউনিটি রেডিও বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং বাংলা নববর্ষের ওপর বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও বেসরকারি চ্যানেলগুলো রমনা বটমূলে ছায়ানট আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে।