দুর্ঘটনার পরই জানা যায় ‘চালকের লাইসেন্স ছিল না’

লাইসেন্স নবায়ন না করেই রাজধানী ও মহাসড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অনেক পরিবহন চালক। দুর্ঘটনার পর চালককে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে ঘুরেফিরে বেরিয়ে আসে কয়েকটি বিষয়— হয় লাইসেন্স ছিল না, না হয় সেটা মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল অথবা হালকা যানের লাইসেন্সে ওই চালক চালাচ্ছিলেন ভারী যান।

কদিন আগে কুড়িল ফ্লাইওভারে শিক্ষার্থীর মৃত্যু এবং উত্তরায় তিন মোটরসাইকেল আরোহীর মৃত্যুর পরও এমনটা জানা গিয়েছিল। প্রশ্ন উঠেছে— সড়ক-মহাসড়কগুলোতে চালকদের লাইসেন্স দেখভাল আদৌ কেউ করছেন?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কাভার্ড ভ্যান বা ট্রাক চালকরা মহাসড়কগুলোতে যানজটে আটকা থাকেন দীর্ঘ সময়। জ্যাম ছাড়লে তাদের মধ্যে দ্রুত পণ্য পৌঁছানোর তাগাদা কাজ করে। এতে সীমা ছাড়ায় গতি, ঘটে দুর্ঘটনা।

গবেষকদের মতে, দুর্ঘটনায় পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখছেন যানবাহন মালিকরাও। তারা একটি ট্রিপ শেষ হওয়ার আগেই অন্য জায়গায় যাওয়ার তাগাদা দেন চালকদের। মানসিক চাপ সামলে চালকরা তখন ঘুম ঘুম চোখে দ্রুত গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার তাগাদা বোধ করেন।

দুর্ঘটনার পর চালকদের আইনের আওতায় আনার পরই ধরা পড়ছে নানা অনিয়ম। কারও লাইসেন্স নেই, কারও লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ, কারও লাইসেন্স এক, গাড়ি আরেক। এ ধরনের অনিয়ম সড়ক-মহাসড়কগুলোর প্রতিদিনের চিত্র।

বিআরটিএ বলছে, জনবল স্বল্পতার পরও বিভিন্ন সড়কে অভিযান চলছে। পুলিশ বলছে, প্রতিনিয়ত যানবাহনের ফিটনেসের পাশাপাশি চালকের লাইসেন্সও তদারকি করছেন তারা।

এদিকে, মহাসড়কগুলোতে দূরপাল্লার চালকদের জন্য এখনও গড়ে তোলা যায়নি বিশ্রামাগার। গাড়ি চুরি ঠেকাতে অনেক চালক গাড়িতেই জিরিয়ে নেন। এতেও চালকদের ঘুম পরিপূর্ণ হয় না এবং গাড়িও থাকে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে।

মাসে ৩০ কোটি টাকা

পুলিশ সদর দফতরের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের এআইজি মোশাররফ হোসেন মিয়াজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিভিন্ন অনিয়মের কারণে সড়কে জরিমানা আদায় বেড়েছে।

‘যাদের লাইসেন্স নেই তারা ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এটা ঠেকাতেও কাজ করছি আমরা।’

তিনি আরও বলেন, ‘সারাদেশে নিবন্ধিত ৪৬ লাখ গাড়ি রয়েছে। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া যেগুলো আছে সেগুলোর বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

‘সব গাড়ি তো প্রতিদিন চেক করা সম্ভব নয়। দেশে ট্রাফিক পুলিশ রয়েছেন ১২ হাজারের মতো। এছাড়া বিভিন্ন টার্মিনালে গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষায় অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রায় ৩০ কোটি টাকার মামলা দায়ের হচ্ছে।’

বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মো. খুরশিদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লাইসেন্স পরীক্ষার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তবে ম্যাজিস্ট্রেট স্বল্পতার কারণেও নিয়মিত অভিযান চালানো যায় না।’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েট-এর দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর চালকের ওপরই দোষ চাপানো হয়। তবে এতে মালিকদের ভূমিকাও আছে। কাভার্ড ভ্যান ও দূরপাল্লার বাস-ট্রাক চালকদের বিশ্রামহীন ও বিরামহীন একাধিক ট্রিপও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কেউ কোনও দায় নেয় না। দায়িত্ব যেমন বিআরটিএর রয়েছে তেমনি ট্রাফিক বিভাগেরও আছে। সেই সঙ্গে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশেরও দায়িত্ব আছে।

‘পরিবহন আইনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইসু এড়িয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নিয়েই মাতামাতি বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সিটি সার্ভিসের বাসগুলোর ৬০ শতাংশ চালকেরই লাইসেন্স নেই। দেখভালের দায়িত্ব যাদের, তারাই যখন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে তখন কিছু করার থাকে না। দুর্ঘটনা ঘটলেই জানা যায়— গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল না কিংবা চালকের লাইসেন্স ছিল না।’