রাজধানীর এজিবি কলোনি, ওয়ারী, স্বামীবাগ এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হওয়ার পরও গ্রেফতার এড়াতে দীর্ঘদিন ধরে এক দম্পতি নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করে আসছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের চালানো অভিযানে ধরা পড়েছেন তারা। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে হেরোইন ব্যবসার বিষয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
অধিদফতর বলছে, মাদক ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সড়কে কোনোধরনের প্রতিবন্ধকতা এড়াতে ব্যবহৃত মোটর সাইকেলে লাগিয়ে রেখেছিল পুলিশের স্টিকার। এছাড়া তারা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হলেও নিজ বাসায় কখনও মাদকের মজুত রাখতো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেফতার এড়াতে এসব কৌশল অবলম্বন করে আসছিল এই দম্পতি।
রবিবার (২৪ এপ্রিল) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিটফোর্ড এলাকার ঢাকা হাসপাতালে সামনে থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন তাকরিম আহমদ নিপুন (২৩), সিমরান হোসেন (২২) ও নার্গিস বেগম (৩৯)।
এসময় তাদের কাছ থেকে মাদক বহনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তল্লাশি করে জব্দ করা হয় ৩৯ গ্রাম হেরোইন। গ্রেফতারকৃত তাকরিম আহমদ নিপুন ও সিমরান হোসেন সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। গ্রেফতারকৃত আরেক নারী নার্গিস বেগম তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত; সে হেরোইন বিভিন্ন জায়গায় সাপ্লাই দিতো। উদ্ধারকৃত ৩৯ গ্রাম হেরোইন ৭৮০ পুরিয়া আকারে বানানো ছিল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক সুব্রত সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, হেরোইন বিক্রি করতে যাওয়ার পথে অভিযান পরিচালনা করে আমরা এই দম্পতিকে গ্রেফতার করি। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে। তা বিশ্লেষণ করে কাদের সাথে যোগসাজশ ছিল সে বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে। এরই মধ্যে তাদের কাছ থেকে রাজধানীতে হেরোইনের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকের নাম পাওয়া গেছে। সেসব তথ্য এবং তাদের কাছ থেকে পাওয়া নামগুলো সম্পর্কে তদন্ত করা হচ্ছে। হেরোইন ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের জানায়, কামরাঙ্গীরচরের এক ব্যক্তির কাছ থেকে তারা হেরোইন সংগ্রহ করতো। সেই ব্যক্তি হেরোইনগুলো রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করে কামরাঙ্গীরচর এবং কেরানীগঞ্জে নিয়ে আসা হতো। পরবর্তী সময়ে এজিবি কলোনি, স্বামীবাগ ও ওয়ারী এলাকায় এসব হেরোইন সরবরাহ করতো। হেরোইন বিক্রির জন্য তাদের ছিল আলাদা সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য রয়েছে। কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচর থেকে হেরোইন সংগ্রহ করে তা ছোটো ছোটো পুরিয়া করে বিক্রি করতো। প্রতি পুরিয়া বিক্রি করা হতো ৩০০ টাকা করে। আর এসব হেরোইন বিক্রির জন্য বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করতো পুলিশ লেখা স্টিকারযুক্ত মোটরসাইকেল। স্টিকার এর ফলে তারা বিভিন্ন জায়গায় সুবিধা পেতো। পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করে তারা এ ধরনের অপতৎপরতা চালিয়ে আসছিল। স্বামী-স্ত্রী মিলে মোটরসাইকেল যোগে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করতো হেরোইন।
অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেফতারকৃত এই দম্পতি সাত থেকে আট বছর ধরে এই হেরোইন ব্যবসার সাথে জড়িত। তারা অন্যকিছু করতো না, শুধু হেরোইন ব্যবসা দিয়ে চলতো তাদের বিলাসী জীবনযাপন। এর আগেও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে এই দম্পতির বাসায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু তখন বাসায় হেরোইন পাওয়া যায়নি। কৌশল হিসেবে তারা হেরোইনগুলো পরিচিত অন্য লোকজনদের কাছে রাখতো। যখন বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হতো তখন সে সব জায়গা থেকে হেরোইনে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করতো।
তারা যে আদতে হেরোইন ব্যবসায়ী, এটা গ্রেফতারকৃত দম্পতির চালচলন এবং বেশভূষা দেখে কখনও বোঝার উপক্রম ছিল না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, এমনভাবে বের হতো বাইরে থেকে কোনোভাবেই আঁচ করার সুযোগ ছিল না কারোর। হেরোইন ব্যবসায়ী বিক্রেতা হলেও নিজেদের বাসায় না রেখে অন্য কাদের বাসায় রাখা হতো তারা সহায়তা করতো এসব বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই দম্পতির বাসায় একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করে ও তাদের কাছ থেকে হেরোইন উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে তাদের কাছ থেকে হেরোইন উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।