সরকারের ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২’ প্রণয়নের উদ্যোগকে সাধুবাদ ও স্বাগত জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, যেভাবে খসড়া তৈরি করা হয়েছে তাতে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার নামে সরকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের কোনও সুযোগ রাখছে কিনা তা ভেবে দেখতে হবে।
সোমবার (৯ মে) টিআইবি আয়োজিত ‘উপাত্ত সুরক্ষা আইন, ২০২২ (খসড়া): পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক আইনটির মূল্যায়নের বিস্তারিত তুলে ধরতে আয়োজিত ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব কথা বলেন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘এটিকে (খসড়া) ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে ঢেলে সাজিয়ে আইনটি প্রণয়ন করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খসড়ায় কিছু কিছু শব্দ বা ধারণার কোনও সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’ আইনের শিরোনামটিও যথাযথ হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
খসড়ায় আইনের দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি প্রয়োগিক দুর্বলতার বিষয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সিকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটার কোনও দরকার ছিল না। এই সীমাহীন ক্ষমতা মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর তদন্ত ক্ষমতা পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর জন্য বিশেষ জ্ঞান প্রয়োজন। এ জন্য বিশেষিত বাহিনীর হাতে তদন্ত ক্ষমতা দেওয়া উচিত।’
তিনি জানান, শ্রীলঙ্কা এই আইনটি তৈরি করে ফেলেছে। ভারত, নেপাল, ভুটান উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
অনুষ্ঠানে মূল উপস্থাপনা (পর্যালোচনা ও সুপারিশ) তুলে ধরেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক শেখ মঞ্জুর-ই-আলম। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ইন্টারনেট ইকোসিস্টেমে যেখানে সবক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাবিষয়ক একটিমাত্র আইন দিয়ে সব ধরনের অবস্থা মোকাবিলা করা সহজ নয় বা চিন্তা করা উচিতও নয়; বরং এটি যথেষ্ট ঝামেলাপূর্ণ কাজ। তারপরও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এ বিষয়ে একটি আইন করার উদ্যোগ গ্রহণকে আমরা অবশ্যই সাধুবাদ জানাই।’
‘তবে দেখা যাচ্ছে, কেবল একটি আইন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে বলেই এই আইনটিরও একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু, এর বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিকগুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। ধারণা করতে অসুবিধা হয় না যে, এর ফলে এটি মূল উদ্দেশ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং তড়িঘড়ি করে প্রণয়ন করা অন্যান্য আইন, বিশেষ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর অপপ্রয়োগের মতোই মারাত্মক সমালোচনার জন্ম দেবে। ফলশ্রুতিতে বেশ কিছু মানুষের হয়রানি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি আবারও নষ্ট হবে’, বলেন তিনি।
পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে এই আইনটি কার্যকর হচ্ছে, সেখানে তাদের পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই ধরনের আইন বাস্তবায়ন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি নতুন। তাই হয়তো একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকরী আইন চট করে করা যাবে না। এ সমস্যার সমাধানের সে জন্য সর্বক্ষেত্রের অংশীজনদের সঙ্গে বসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি বিষয়গুলো খুঁজে বের করে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য আইনের মধ্যে বিধান অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে সংযুক্ত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের সিনিয়র লেকচারার ড. এরশাদুল আমিন। তিনি জানান, বিশ্বের ১৯২টি দেশের মধ্যে ১৩৭টি দেশে এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘খসড়ায় অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ শব্দের সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। ব্যক্তিগত তথ্যের কোনও সংজ্ঞা বা উদাহরণ খসড়ায় অনুপস্থিত। এসব বিষয় নিয়ে আরও পর্যালোচনা হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
আইনটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করে টিআইবি বলছে, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য সারাবিশ্বে বিভিন্ন ধরনের আইনের মডেল রয়েছে। ইতোমধ্যে করা বিশ্বের ১৩৭টি দেশের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর অপপ্রয়োগের বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে আলোচ্য আইনটির বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।