বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা: ‘প্রবেশন’ কার্যক্রম চলছে কীভাবে

সমাজে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে বলে সতর্ক করে আসছেন সংশ্লিষ্টরা। সামাজিক এই ব্যাধির লাগাম টানতে অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির পরিবর্তে প্রাথমিক ব্যবস্থা হিসেবে সংশোধন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। কারাগারের বদলে নিজ পরিবেশে সমাজে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই কাজটি তত্ত্বাবধান করে থাকে সমাজসেবা অধিদফতর।

কোনও অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি স্থগিত রেখে, কারাবদ্ধ না রেখে বা কোনও প্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ না করে সমাজে খাপ খাইয়ে চলার সুযোগ প্রদান করাকে প্রবেশন বলা হয়। ১৯৬০ সালে জারি করা ‘দ্য প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিন্যান্স’-এর মধ্য দিয়ে কার্যক্রমটির যাত্রা শুরু হয়, যা ১৯৬৪ সালে সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৬২ সালে দ্বিতীয় পাঁচসালা পরিকল্পনায় সংশোধনমূলক এই কার্যক্রম চালু হয়, যার মধ্যে ‘প্রবেশন অব অফেন্ডার্স প্রকল্প’ ও ‘আফটার কেয়ার সার্ভিসেস’ বাস্তবায়ন হয়। অর্ডিন্যান্সের পাশাপাশি ২০০৬ সালের ‘কারাগারে আটক সাজাপ্রাপ্ত নারীদের বিশেষ সুবিধা আইন’ ও ২০১৩ সালের ‘শিশু আইন’ যুক্ত হয়েছে।

বর্তমানে ছয়টি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) কোর্টসহ ৬৪টি জেলায় মোট ৭২টি ইউনিটে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব ইউনিটের প্রবেশন কর্মকর্তা ছাড়াও সব উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বিভাগীয় শহর সমাজসেবা কর্মকর্তারা প্রবেশন কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তবে গত ২৮ জুলাইয়ের তথ্য বলছে, এখন ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট ও রংপুরসহ ১৭ জন প্রবেশন কর্মকর্তার পদ ফাঁকা রয়েছে। এসব পদে অন্য কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিএমএম কোর্টসহ বিভাগীয় শহর ও জেলা প্রবেশন কর্মকর্তার পদ থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় জনবল। ‘একাই একশ’ নীতিতে কাজ করতে হয় এসব কর্মকর্তাকে, যা পুরো কার্যক্রমকে অনেক সময় স্থবির করে তোলে বলে অভিযোগ করা হয়। তার মধ্যেও সম্প্রতি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সুনামগঞ্জের একাধিক ঘটনা।

চলতি বছরের ২০ জুলাই সুনামগঞ্জে ৬৫ শিশু-কিশোর ও ২৫ দম্পতিকে শর্তসাপেক্ষে প্রবেশন দেন জেলা নারী ও শিশুনির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেন। শর্তের মধ্যে রয়েছে- দিনে দুটি ভালো কাজ করে ডায়েরিতে লিখে রাখা, গাছ লাগানো ও পরিচর্যা, নিয়মিত ধর্ম পালন, মা-বাবার আদেশ মেনে চলা, মাদক থেকে দূরে থাকা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ ইত্যাদি।

এর আগেও একই বিচারক মোট ১৪৫ মামলায় ২০০ শিশু-কিশোরকে অপরাধের জন্য কারাগারে না পাঠিয়ে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন আদালতের পিপি নান্টু রায়। মূলত বিচার শেষে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার উপক্রম হলে বিশেষ সুযোগ হিসেবে প্রবেশন দিয়ে থাকে আদালত। এটি আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও দিতে পারেন, আবার প্রবেশন কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেও দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময়ে শর্তগুলো মানা হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করেন প্রবেশন কর্মকর্তারা।

বিশেষ করে ছোটখাটো মামলা বা অপরাধের ক্ষেত্রে প্রবেশ দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে তারা সংশোধন হয়ে সমাজের মূলধারার সঙ্গে সমানতালে চলতে পারেন। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের প্রবেশসন কর্মকর্তা শফিউর রহমান জানান, আদালতের রায়ে প্রবেশ পাওয়া শিশু ও দম্পতিরা বেশ উচ্ছ্বসিত। এখন নিয়ম অনুযায়ী, তিন মাস পরপর পুরো এক বছর আদালতে তাদের বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দেবেন তিনি।

সমাজসেবা অধিদফতরের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সমাজসেবার অধীনে উপকারভোগীর মঞ্জুরকৃত প্রবেশনারের সংখ্যা ৩ হাজার ৬৫৯টি। ডাইভারশন সুবিধাপ্রাপ্ত শিশু ১ হাজার ৩৩টি এবং পুনর্বাসন ৩ হাজার ৪৮৭টি। মোট সেবাগ্রহীতার সংখ্যা ৮ হাজার ১৭৯টি। ২০২০-২১ অর্থবছরে ডাইভারশন সুবিধাপ্রাপ্ত ছিল ১ হাজার ৫৩৫ এবং পুনর্বাসিত হয় ২ হাজার ৪৫৮।

অধিদফতরটির অন্তত তিন জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, প্রবেশন অব অফেন্ডার্স অর্ডিনেন্সের ৫ ধারা, শিশু আইনের ৩৪ ধারার ৬ উপধারার অধীন প্রদান করেন আদালত। প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে নিজ পরিবার ও সামাজিক পরিবেশে রেখে অপরাধ সংশোধন ও সামাজে একীভূত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। এটি একটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সংশোধনীমূলক কার্যক্রম, যা সুনিয়ন্ত্রিত কর্মপদ্ধতি। এর ফলে অপরাধীকে পুনঃঅপরাধ রোধ ও আইন মান্যকারী নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়।

প্রবেশন নিয়ে আলাদা কোনও প্রকল্প নেই উল্লেখ করে তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে এটি অধিদফতরের কার্যক্রম শাখার আওতায় প্রবেশন ও চিকিৎসা কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এর অধীনে তিনটি শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে- একটি গাজীপুরের টঙ্গীতে (বালক), আরেকটি কোনাবাড়িতে (বালিকা) ও অন্যটি যশোরের পুলের হাটে (বালক)।

প্রবেশন নিয়ে পরিকল্পনার বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তারা বলছেন, পুরো প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করতে ১৯৬০ সালের অর্ডিনেন্সটি আধুনিকায়নের একটি খসড়া প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া ক্রমশ বেড়ে চলা ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে একটি কৌশলপত্র তৈরি করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কিশোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি ১৬ বছর করা হলে কিশোর-কিশোরীদের অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা কমবে। তা ছাড়া নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজসেবার একার পক্ষে পরিস্থিতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশে ৭০ হাজারের মতো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রয়েছে, তারা এগিয়ে এলে এবং কিছু কার্যক্রম গ্রহণ করলে সুফল মিলবে।

বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে নারী আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি। সংগঠনটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রবেশন কর্মকর্তারা অনেক জায়গায় সেভাবে সক্রিয় নন, কেবল নামে আছে। তাদের ঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না, নিয়মিত প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় যথেষ্ট পরিমাণ সহায়তা করতে পারছে না।’

উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রবেশনে থাকা শিশুদের উন্নয়ন কেন্দ্রে খুনোখুনির মতো ঘটনাও ঘটছে। এগুলোতে থাকা ও মানসিক উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ নেই। আদালতের রায় নিয়ে কেন্দ্র পরিদর্শনে যেতে হয়। এসব কারণে এই কার্যক্রমটির কার্যকর সুফল পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ। এই অবস্থার পরিবর্তনে সংশ্লিষ্টদের আরও আন্তরিক ও দায়িত্ববান হতে হবে, নীতি নির্ধারকদেরও মনোযোগী হতে হবে।